পচে যাওয়া ধানে তাকিয়ে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস

পচে যাওয়া ধানে তাকিয়ে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

হাওরের বাতাসে এখন আর পাকা ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ নেই। মাড়াই কলের সেই পরিচিত শব্দের বদলে সেখানে এখন কেবল বৃষ্টির অবিরাম শব্দ। কিশোরগঞ্জের শান্তিপুর গ্রামের কৃষক আবু সালেক তার স্তূপ করে রাখা ধানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই এই ধান বাজারে থাকার কথা ছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সেই ধানে এখন পচন ধরছে, অনেক ধান থেকে বেরিয়ে আসছে সাদাটে অংকুর।

আবু সালেক কষ্টের সুরে জানান, তারা বুক সমান পানিতে নেমে এই ধান কেটে এনেছিলেন। এখন সেই ধান পচে নষ্ট হচ্ছে, কারণ কোনো পাইকার ধান কিনতে আসছেন না। সরকারি গুদামে এই ধানকে মানহীন বলা হচ্ছে। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, অতিবৃষ্টি শুধু তাদের ক্ষেত কেড়ে নেয়নি, তাদের দরদাম করার ক্ষমতাও কেড়ে নিয়েছে। পুরো বছরের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে তিনি এখন দিশেহারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা মিলিয়ে প্রায় ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান এখন পানির নিচে। এই পরিমাণ আরও বেড়ে ৭৭ হাজার হেক্টর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। দেশের মোট বোরো ধানের এক-পঞ্চমাংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। ফলে হাওরের এই ক্ষতি সারা দেশের চালের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইটনার পূর্বগ্রামের কৃষক মহসিন মিয়া জানান, অন্য বছরগুলোতে পাইকাররা খলায় এসে ধান কিনে নিয়ে যেতেন। তখন ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে তিন থেকে পাঁচ দিন টানা রোদের প্রয়োজন হয়। রোদ না থাকায় ধান পচে যাচ্ছে, বাজারে এর দাম মণপ্রতি মাত্র ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে।

ছবি: টাইমস

সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সাধারণ কৃষকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। মহসিন মিয়া জানান, সরকারি গুদামে ধান নিয়ে গেলে নানা অজুহাতে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দালালদের মাধ্যমে ঠিকই সেই ধান গুদামজাত হয়। সংসারের খরচ আর ঋণের চাপে কৃষকরা বাধ্য হয়ে অনেক আগেই কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে দেন।

অষ্টগ্রামের কৃষক সালাউদ্দিন শরীফ হিসাব করে দেখান, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগে যেখানে একজন শ্রমিকের মজুরি ছিল ৮০০ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় হাজার টাকায়। সেই তুলনায় ধানের দাম কেজি প্রতি মাত্র সাড়ে ১২ টাকার মতো। ফলে কৃষকদের খরচের অর্ধেকও উঠে আসছে না।

আরও পড়ুন

ইটনার কালিমপুর গ্রামের মো. মোয়েজউদ্দিন বলেন, সরকারি দামে ধান বিক্রি করার সাহস তাদের মতো ক্ষুদ্র কৃষকদের নেই। সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্রতা আর গুণমানের কড়াকড়ি থাকে, যা বৃষ্টির এই মৌসুমে পূরণ করা অসম্ভব।

ইটনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বাবুল আকরাম এই সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ভেজা বা আর্দ্রতাযুক্ত ধান কেনার কোনো আইনি বিধান তাদের নেই। উপরমহলের অনুমতি ছাড়া তারা নিম্নমানের ধান কিনতে পারেন না।

ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর অবশ্য কৃষকদের আশ্বস্ত করে ধান বিক্রিতে কোনো হয়রানি হলে সরাসরি তাকে জানাতে বলেন। অনিয়মের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। করিমগঞ্জের খায়রাত গ্রামের হাবিবুর রহমান জানান, তার পাঁচ একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এমনকি গরুর খাবারের জন্য রাখা খড়টুকুও পচে গেছে। এখন নিজেরা কী খাবেন আর গবাদিপশুকে কী খাওয়াবেন তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তিত।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানান, জেলায় ১২ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার কৃষক। ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আগামী তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। তবে এই সহায়তা কবে থেকে শুরু হবে তার সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঠিক হয়নি।

হাওরের কৃষকরা এখন কেবল প্রকৃতির সাথে নয়, বরং বাজারের অব্যবস্থাপনা আর কঠিন নিয়মের সাথেও যুদ্ধ করছেন। আবু সালেক তার হাতের মুঠোয় থাকা কয়েকটা ধান নাড়াচাড়া করতে করতে বিষণ্ণ মনে বলেন, তারা পানির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকেন। কিন্তু এবার সেই পানি তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad