দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আবাসন সুবিধার দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন রয়েছে ৬ হাজার ৪৯৩টি। ফলে আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ২৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী, আর বাকি প্রায় ৭৪ শতাংশই থাকছেন আবাসনের বাইরে। শিক্ষার্থীর অনুপাতে আবাসন সুবিধার এই হার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) তুলনায় কম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪টি আবাসিক হলের এসব আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চার গুণ। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা, মেস ও কটেজে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। আবাসনের এই সংকটের তুলনামূলক চিত্রে রাবিতে ৩০ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ঢাবিতে প্রায় ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পেলেও জাবি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বই থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ২৪ হাজার ৯৪২ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১৪ হাজার ৫৮৩ জন, ছাত্রী ১০ হাজার ৩৫৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের একজন শিক্ষার্থী রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক হল রয়েছে ১৪টি। এর মধ্যে নয়টি ছাত্রদের এবং পাঁচটি ছাত্রীদের জন্য। এসব হলে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষঙ্গিক মিলিয়ে মোট আসন রয়েছে ৬ হাজার ৪৯৩টি। অর্থাৎ প্রায় ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসিক সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ভর্তি কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২ হাজার ৮৮১ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ২০ হাজার ৭২৯ জন এবং ছাত্র ২২ হাজার ১৫২ জন। এই শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১৯টি আবাসিক হল ও চারটি হোস্টেল। এর মধ্যে ছাত্রদের জন্য ১৩টি, ছাত্রীদের জন্য পাঁচটি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি হল রয়েছে। বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী, মোট শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক সুবিধা পান ৯ হাজার ৬৭৩ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৩০ দশমিক ২৩ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ১৭টি আবাসিক হল ও একটি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি। এর মধ্যে ১১টি হল ছাত্রদের এবং ছয়টি ছাত্রীদের জন্য।
অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা ১৪ হাজার থেকে ১৪ হাজার ৬০০-এর মধ্যে। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীই তাদের প্রাপ্য আবাসিক হলের আসন পেয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২১টি আবাসিক হল রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি ছাত্রদের এবং ১০টি ছাত্রীদের জন্য।
স্বায়ত্তশাসিত এ চার বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধার তথ্য তুলনা করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীর অনুপাতে আবাসিক সুবিধার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান অন্য তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পিছিয়ে। বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চবির আবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও চবির তুলনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেশি শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বইয়ের আবাসিক হলগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ছেলেদের নয়টি হলে আমানত হলে ৬৩২, শাহ আবদুর রব হলে ৫০৯, শাহজালাল হলে ৪৭৫, সোহরাওয়ার্দী হলে ৩৭৫, আলাওল হলে ২৬০, এ এফ রহমান হলে ২৫৮, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ১৭৬, শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে ৭৫০ এবং অতীশ দীপঙ্কর হলে ৩১২টি আসন রয়েছে।
ছাত্রীদের হলগুলোর মধ্যে বিজয় ২৪ হলে ৭৫০, প্রীতিলতা হলে ৫৩১, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলে ৫০৮, শামসুন্নাহার হলে ৪৮১ এবং মাস্টারদা সূর্য সেন হলের সংশ্লিষ্ট অংশে ৩৯টি আসন রয়েছে। (পাশাপাশি হোস্টেল ও অন্যান্য সংযোজন মিলিয়ে মোট আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬,৪৪৩টিতে)।
২৪ হাজার ৯৪২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে এই আসন সংখ্যা হিসাব করলে বর্তমানে প্রায় ২৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন এবং বাকি প্রায় ৭৪ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন বঞ্চিত রয়েছেন।
আবাসিক সংকটের কারণে চবির প্রায় ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের আশেপাশে এবং বাইরে থাকতে হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের শহরে বাসা নিয়ে থাকছেন। আবার শহরে বাসাভাড়ার অতিরিক্ত ব্যয় ও নিয়মিত যাতায়াতের ভোগান্তি এড়াতে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন কটেজে থাকছেন। এসব কটেজের অনেকগুলোই শিক্ষার্থীদের বসবাসের জন্য পর্যাপ্ত উপযোগী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরবি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘হলে সিট না পাওয়ায় আমি টিনশেডের একটি কটেজে উঠেছি। এখানে ছোট একটি রুমে ২জনকে থাকতে হয়। পরিবেশও নোংরা, এমনকি টয়লেটও পরিষ্কার করা হয় না। আবাসন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে আমাদের এত কষ্ট করে থাকতে হতো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একে তো বসবাস উপযোগী পরিবেশ নেই তার ওপর অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়। নতুন হল নির্মাণ এবং পুরাতন হল মেরামত করলে আবাসিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব বলে মনে করি।’
রসায়ন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আঁখি আক্তার দক্ষিণ ক্যাম্পাসে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘এখানে বাসা ভাড়া অনেক বেশি এবং আমাদের অনেক কিছুর ভোগান্তি পোহাতে হয়। যেমন ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে লোডশেডিং হয় না বললেও চলে, কিন্তু এখানে বিদ্যুৎ একবার গেলে আসার খবর থাকে না। এ ছাড়াও অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ভাতার ব্যবস্থা করে তাহলে আমাদের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হয়।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সাফওয়ান শহরে থেকে নিয়মিত ক্লাস করার ভোগান্তির কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা যারা শহর থেকে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস করি, তারাই বুঝি কী পরিমাণ ভোগান্তি আমাদের পোহাতে হয়। এখানে তো বাসা ভাড়া বেশি, তার ওপর আমাদের শাটলে যাতায়াতেও ভোগান্তি পোহাতে হয় অনেক।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৬ হাজারের মতো শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পায়, আর আমরা বাকিরা বঞ্চিত। প্রশাসন নতুন হলের জন্য সরকারকে চাপ দেওয়া উচিত। আমাদের আরো অন্তত ১০-১২টি হল লাগবে।’
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কণা মহাজন বলেন, ‘শহর থেকে এসে নিয়মিত ক্লাস করে আবার শহরে ফিরে যাওয়া অনেকটা ভোগান্তির। প্রশাসনের উচিত আবাসিক সংকট দূর করা। সেক্ষেত্রে যেসব ছেলে-মেয়ে উভয়ের যেসব হলে ডাবলিং সম্ভব সেগুলোতে ডাবলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং এর পাশাপাশি নতুন হল নির্মাণ করা।’
তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শতভাগ আবাসনের সুবিধা পেলে চবি কেন পাবে না, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ই তো শতভাগ আবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ইউজিসিতে চাপ প্রয়োগ করে আমাদের দাবি আদায় করা।’
আবাসনসংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) কাজ করছে বলে জানিয়ে চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁঞা জানান, ইতোমধ্যে প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কিছু হলে আসন বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে শহীদ ফরহাদ হলের এক্সটেনশন ভবনে ৮৮ জন শিক্ষার্থী উঠেছে, শাহজালাল হলে ৯০টি আসন বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং সোহরাওয়ার্দী হলে ১৯ জন শিক্ষার্থী ওঠার ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে।
পাশাপাশি আরও কিছু হলের কাজ চলমান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাস্টারদা সূর্য সেন হলের স্টাফ কোয়ার্টারে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী ওঠার কাজ চলছে এবং পুরাতন শামসুন্নাহার হলে ২০০ জন শিক্ষার্থী ওঠার ব্যবস্থা করার কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার নারী শিক্ষার্থীর নতুন একটি হলের কাজ এবং নতুন ১০টি হলের প্রস্তাবনা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন পর্যায়ে রয়েছে।
নতুন হলগুলোর কাজ শেষ হতে সময় লাগবে উল্লেখ করে ইসহাক ভূঁঞা বলেন, ‘কাজ শেষ হতে তো সময় লাগবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা ছিল, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রত্যেকটা কার্যনির্বাহী সবাই আমরা আবাসন নিয়ে কথা বলেছি। নতুন হল আসছে কিনা, কতটুকু অগ্রগতি এগুলো নিয়ে বারবার প্রশাসনের ওপর প্রেসার ক্রিয়েট করছি। মিটিং মনে হয় আমরা ৫০-এর অধিক মিটিং করেছি আবাসন নিয়ে।’
আবাসিক সংকটের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সমস্যার মধ্যে আবাসন সমস্যা অন্যতম। কারণ আমরা ওয়ান থার্ড শিক্ষার্থীকেও আবাসন সুবিধা দিতে পারিনি। আবাসন সমস্যার সমাধান এগুলো দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যে ডিপিপিতে একটি প্রকল্প হয়েছে। তবে আমি চাইলেই ডিপিপি পাস করে নিয়ে আসতে পারব না। কারণ এগুলো অনেকগুলো প্রসিডিওর সমাপ্ত করে আসে। এ কাজগুলোর সময়গুলো যদি কমানো যেত, তাহলে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকল্পগুলোতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাওয়া যেত।’


