কাগজে পর্যাপ্ত সার, মাঠে হাহাকার

কাগজে পর্যাপ্ত সার, মাঠে হাহাকার
গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা নিয়ে গেছে স্থানীয়রা। ছবি: ভিডিও থেকে
Advertisement
Advertisement

চলতি আমন মৌসুমে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে বারবার আশ্বস্ত করছে সরকার। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। চাহিদার আসল সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে মারাত্মক সারসংকট। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হচ্ছে চড়া দাম, আর সার কিনতে গিয়ে পদে পদে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ কৃষক।

সরকারি খাতা-কলমের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির এই বড় গরমিল সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমের দুই জেলা-কুড়িগ্রাম ও মাগুরায়। সরকারি খাতায় এই দুই জেলাতেই সারের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। অথচ বাস্তবে সাধারণ এক বস্তা সার জোগাড় করতে কৃষককে দিনভর ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, জেলাগুলোতে চাহিদামতো সার সরবরাহ করা হয়েছে। সরবরাহ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য ডিলারদের সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দ আগস্টের শেষেই তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা টাকা নিয়ে গেলেও সার দিচ্ছে না। আবার অনেক দোকানদার ৫০ কেজির পুরো বস্তা ভাঙতে চান না। ফলে যাদের মাত্র ৫ বা ১০ কেজি সার প্রয়োজন, তাদের বাধ্য হয়ে পুরো বস্তা কিনতে হচ্ছে, যা অনেক ক্ষুদ্র চাষির সাধ্যের বাইরে।

কুড়িগ্রামে অস্ত্রধারীদের পাহারায় সার বিতরণ

কুড়িগ্রামে এবার ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে, যার জন্য ৫৩ হাজার ৯৫০ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের দাবি, আগাম সার তোলায় এখানে কোনো সংকট নেই।

কিন্তু ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট বাজারে দেখা গেল বাস্তব চিত্র। বুধবার বিএডিসির ডিলার ‘মেসার্স রাকিবুল ট্রেডার্স’-এর সামনে সার না পেয়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা সোনাহাট স্থলবন্দরের প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পুলিশ ও বিজিবির সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতিতে সার বিক্রি করতে হয়।

আরও পড়ুন

উক্ত ডিলার স্বীকার করেন, সেদিন নির্ধারিত দিন না থাকলেও কৃষকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে সার ছেড়েছেন।

প্রশাসন ঘাটতির কথা অস্বীকার করলেও কুড়িগ্রাম সদরের কৃষক আবদুস সবুর আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রথমে খরার কারণে ক্ষতি হলো, এখন সার পাচ্ছি না। অনেক দেনদরবার করে কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেশি দিয়ে অল্প কিছু সার পেয়েছি।’

বাজারে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা গেছে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের। সরকারিভাবে টিএসপির দাম ২৭ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। ২১ টাকার ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ টাকায়। ভূরুঙ্গামারীর ধলডাঙ্গা বাজারে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা এক প্রাইভেট গুদামে হানা দিয়ে ১০ হাজার কেজি অবৈধ সার ধরে ফেলে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা পরিদর্শকদের চোখ ফাঁকি দিতে আসল সার অবৈধ গুদামে লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।

মাগুরায় ‘বাধ্যতামূলক ক্রয়

একই অবস্থা মাগুরাতেও। জেলার ৬১ হাজার ৯৫৫ হেক্টর আমন ক্ষেতের জন্য টিএসপি ও ডিএপি সারের তীব্র সংকট চলছে। কৃষকদের অভিযোগ, তাদের চাহিদামতো সার দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি টিএসপি বা ডিএপি সার কিনতে গেলে ডিলাররা অপ্রয়োজনীয় অন্য সার বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য করছেন।

মাগুরার কৃষক স্মৃতি রঞ্জন বলেন, ‘দরকারি সার যদি সময়মতো না পাই, তবে ফসলের ভালো ফলন পাব কীভাবে?’

অথচ মাগুরার সরকারি গুদামে হাজার হাজার টন সার মজুদ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বিএডিসি ও বিসিআইসি। ডিলাররাও তাদের ছয় মাসের বরাদ্দ পুরোপুরি তুলে নিয়েছেন। তবে খুচরা বিক্রেতারা স্বীকার করছেন—ডিএপি ও টিএসপির মূল চাহিদা মাঠে অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় দোকানে সরবরাহ কম।

এখানেও মূল সমস্যা অবৈধ মজুদ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসেই মাগুরার বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৭০০ বস্তারও বেশি অবৈধ সার জব্দ করে প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করেছে।

সারের নয়, সদিচ্ছার সংকট

সব তথ্য বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়–চলতি আমন মৌসুমে দেশে সারের কোনো বাস্তব ঘাটতি নেই। দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা, প্রশাসনের ঢিলেঢালা নজরদারি এবং অসাধু ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। ফসলের এই সংকটময় মুহূর্তে বাজার কারসাজি ও কালোবাজারি শক্ত হাতে দমন না করলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি বড় ঝুঁকিতে পড়বে দেশের সার্বিক খাদ্য উৎপাদন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
টাইমস রিপোর্ট
টাইমস রিপোর্ট

Staff Reporter, Times of Bangladesh

সম্পর্কিত খবর