এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা আইনি লড়াই ২০২৩ সালে স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করেছিল গ্রামীণফোন (জিপি)। সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বিলম্বিত শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) অর্থের ওপর জমা হওয়া সুদ পরিশোধ এড়াতেই কোম্পানি কৌশল হিসেবে মামলাটি প্রত্যাহার করে।
মামলাটি প্রত্যাহারের পরই এক হাজারের বেশি সাবেক কর্মী শ্রম আদালতে গিয়ে বিলম্বিত ডব্লিউপিপিএফ অর্থের আইনগত সুদ দাবি করার সুযোগ পান।
এখন সেই দাবির মুখে জিপি আবার হাইকোর্টে ফিরেছে। কোম্পানিটি নতুন একটি রিট আবেদন করে এমন একটি শ্রম আইনের ধারাই চ্যালেঞ্জ করেছে, যেটি তাদের সম্ভাব্য দায়ের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারে।
২০২৬ সালের ৫ জুলাই করা ওই রিটে কোম্পানি শ্রম আইনের সেই বিধান বাতিল বা পরিবর্তনের আবেদন করেছে, যেখানে বকেয়া ডব্লিউপিপিএফ অর্থের ওপর প্রতি বছর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া লভ্যাংশের ৭৫ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর জিপি আদালতের কাছে চেয়েছে, এই ক্ষেত্রে আইনে থাকা তুলনামূলক কম হারের বিকল্পটি প্রযোজ্য করা হোক–ব্যাংক হারের চেয়ে ২৫০ বেসিস পয়েন্ট বেশি। জিপি এই রিটে জয়ী হলে সাবেক কর্মীদের দাবিকৃত সুদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, প্রথমে মামলা করে তাদের দাবি শ্রম আদালতে নেওয়ার পথ দীর্ঘদিন আটকে রেখেছিল জিপি। পরে তারা শ্রম আদালতে পাওনা আদায়ের মামলা শুরু করলে কোম্পানি আবার আদালতে গিয়ে সুদের হিসাব নির্ধারণকারী আইন চ্যালেঞ্জ করেছে।
জিপির দাবি, কর্মীদের সঙ্গে সমঝোতার পর ২০১১ সালের রিটটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল এবং নতুন রিটের উদ্দেশ্য হলো আইনের ব্যাখ্যা পরিষ্কার করা।
কোম্পানিটি বলছে, ২০১৩ সালের পর ডব্লিউপিপিএফ-সংক্রান্ত কোনো বিরোধ নেই। ওই বছর আইন সংশোধন করে মোবাইল অপারেটরদেরও এই তহবিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই বিরোধের শুরু ২০১১ সালে যখন টেলিকম অপারেটরদের বার্ষিক মুনাফার ৫ শতাংশ ডব্লিউপিপিএফে দেওয়ার জন্য ২০১০ সালের সরকারি আদেশ চ্যালেঞ্জ করে জিপি।
হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ার পর টেলিকম খাতে মুনাফা ভাগাভাগির এই বাধ্যবাধকতার আইনি অবস্থান বেশ কয়েক বছর অনিষ্পন্ন ছিল।
২০১৩ সালে সরকার বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সংশোধন করে মোবাইল টেলিকম অপারেটরদের ডব্লিউপিপিএফে অবদান রাখা বাধ্যতামূলক খাতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। একই সঙ্গে সুবিধাভোগীর পরিধিও বাড়ানো হয়।
টাইমস অব বাংলাদেশের প্রশ্নের জবাবে জিপি জানিয়েছে, আইন সংশোধনের পর থেকে তারা ডব্লিউপিপিএফের সব বাধ্যবাধকতা পালন করে আসছে এবং এ জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ডও গঠন করেছে।
বর্তমান বিরোধটি মূলত ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালের অর্থ নিয়ে—যে সময় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে কোম্পানি ডব্লিউপিপিএফ অর্থ পরিশোধ বন্ধ রেখেছিল।
শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি ডব্লিউপিপিএফের অর্থ ব্যবহার করলে তাকে দুই ধরনের হারের মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে সুদ দিতে হয়। একটি হলো ব্যাংক হারের চেয়ে ২৫০ বেসিস পয়েন্ট বেশি এবং অন্যটি হলো সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া লভ্যাংশের ৭৫ শতাংশ।
সাবেক কর্মীদের দাবি, জিপি বছরের পর বছর তাদের প্রাপ্য ডব্লিউপিপিএফ অর্থ আটকে রেখেছিল এবং আইনে নির্ধারিত উচ্চতর লভ্যাংশভিত্তিক সুদের হারই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
জিপির যুক্তি, পুরোনো সময়ের ওপর লভ্যাংশভিত্তিক সুদের হার প্রয়োগ করলে অস্বাভাবিক বড় দায় তৈরি হবে।
একই সঙ্গে কোম্পানি বলছে, অধিকাংশ সাবেক কর্মী এরই মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছিলেন। মূল রিট চলমান থাকা অবস্থায় আদালতের অনুমতি নিয়ে জিপি ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি কর্মীকে মূল ডব্লিউপিপিএফ অর্থ পরিশোধ করে।
কোম্পানিটির দাবি, তৎকালীন কর্মী প্রতিনিধি সংগঠন গ্রামীণফোন পিপলস কাউন্সিলের (জিপিপিসি) সঙ্গে সমঝোতার পর অধিকাংশ যোগ্য কর্মী এমন অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন, যেখানে ভবিষ্যতে সুদের দাবি না করার কথা বলা ছিল।
সাবেক কর্মীরা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, ওই চুক্তিগুলো শুধু মূল অর্থ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল; বছরের পর বছর বিলম্বের কারণে জমা হওয়া আইনগত সুদের অধিকার তারা ত্যাগ করেননি।
তারা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি ২০১৫ সালেই বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে, তাহলে জিপি কেন ২০২৩ সাল পর্যন্ত রিট চালিয়ে গেল।
জিপির বক্তব্য, সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পরই রিট প্রত্যাহার করা হয় এবং আদালতের প্রক্রিয়াগত কারণে মামলাটি এতদিন চলমান ছিল।
দাবির পরিমাণ নজিরবিহীন
এই বিরোধ দেশের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য আর্থিক দাবির রূপ নিয়েছে।
সাবেক কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্বিত বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদের দাবি, লভ্যাংশভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪ হাজার সাবেক কর্মীর প্রত্যেকের পাওনা ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। পরিষদটির হিসাবে, মোট দাবির পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ কোটি টাকা।
পরিষদের যোগাযোগ সম্পাদক আদিবা জেরিন চৌধুরী বলেন, কর্মীরা যদি দাবির ৯৯ শতাংশও ছেড়ে দেন, তারপরও বাকি অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা হবে। জিপি এই হিসাবের ভিত্তি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, আইনি কৌশলে বিলম্ব
সাবেক কর্মীরা বলছেন, সর্বশেষ আইনি পদক্ষেপটি গ্রামীণফোনের শ্রম বিরোধ পরিচালনার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যেখানে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে কর্মীরা প্রতিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
আদিবা জেরিন চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, গ্রামীণফোনের শ্রম বিরোধগুলো এমন একটি ধারাবাহিক আচরণের উদ্বেগ তৈরি করে, যেখানে বারবার মামলা ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া কর্মীদের দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত করেছে।
তিনি বলেন, গঠনমূলক আলোচনা ও সমঝোতার পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধগুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছে। এ ধরনের আচরণ বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং এ বিষয়ে সরকারের জরুরি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
জিপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা আইনি প্রক্রিয়াকে সম্মান করে এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেনে চলবে।
কর্মী-শেয়ারহোল্ডারকে করা হয়েছে প্রথম আবেদনকারী
সাবেক কর্মীরা নতুন রিটে জিপির শিল্প সম্পর্ক বিভাগের প্রধান এবং একজন সাধারণ শেয়ারহোল্ডার মোহাম্মদ আউলাদ হোসেনকে প্রথম আবেদনকারী করায়ও প্রশ্ন তুলেছেন।
রিটে বলা হয়েছে, আউলাদ হোসেন একজন প্রকৃত শেয়ারহোল্ডার এবং ২০০৯ সাল থেকে তার কাছে জিপির ১২ হাজার ৬৪৩টি শেয়ার রয়েছে। জিপি দ্বিতীয় আবেদনকারী।
সাবেক কর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন কর্মী-শেয়ারহোল্ডার কেন এমন একটি আইনি চ্যালেঞ্জে অংশ নিচ্ছেন, যা কর্মীদের সম্ভাব্য পাওনা কমিয়ে দিতে পারে—যার সুবিধাভোগী তিনিও হতে পারেন।
তাদের দাবি, তার শেয়ারহোল্ডিংয়ের মূল্য আইনে নির্ধারিত সুদের সম্ভাব্য পাওনার তুলনায় নগণ্য।
জিপি টাইমসকে বলেছে, আউলাদ হোসেন শুধু শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রিটে যুক্ত হয়েছেন এবং তার কর্মী পরিচয়ের সঙ্গে এই মামলার কোনো সম্পর্ক নেই।
হাইকোর্ট এখনো রিটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়নি। জিপির পক্ষে রায় এলে সুদের হিসাব সীমিত হওয়ায় সম্ভাব্য দায় ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে।
আর আদালত সাবেক কর্মীদের পক্ষে গেলে, তাদের দাবিকৃত অঙ্ক উচ্চতর লভ্যাংশভিত্তিক সুদের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে পারে–তাদের হিসাবে যার পরিমাণ বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ২১ গুণ।


