চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার সময় মোহাম্মদ সাইদুলের বয়স ছিল সাত বছর। এরপর পাঁচ বছর ধরে ছেলের সন্ধানে ছিলেন তার পরিবার। তাদের একটাই প্রশ্ন ছিল, ‘আমার সন্তান কোথায়?’
সাইদুলের বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল সম্ভাব্য সব জায়গায় ছেলেকে খুঁজেছেন। খুলশী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আত্মীয়, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চালান। সম্ভাব্য সূত্র ধরে ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি।
২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল, নিখোঁজের পাঁচ বছর পর একটি জাতীয় দৈনিকের ফেসবুক পেজে ছেলের ছবি দেখতে পান মোস্তফা। সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে যোগাযোগ করে শেষ পর্যন্ত ছেলেকে ফিরে পান তিনি।
মোস্তফা টাইমসকে বলেন, ‘ওই পাঁচ বছর আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের ছিল। আমার ভাই, বন্ধু, বয়োজ্যেষ্ঠ স্বজন ও চাচারা বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছেন। আমরা তার জন্য কেঁদেছি। সম্ভব সব চেষ্টা করেছি।’
সাইদুল ভুল করে চট্টগ্রাম থেকে একটি ট্রেনে উঠে ঢাকায় চলে আসে। এরপর পাঁচ বছর রাজধানীতে পথশিশুদের সঙ্গে ছিল। বোতল কুড়িয়ে ও ভাঙারি দোকানে কাজ করে জীবন চালিয়েছে।
মোস্তফা বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এখন সে একটি মাদ্রাসায় পড়ছে। পরীক্ষায়ও পাস করেছে।’
সাইদুলের মতো ফিরে আসার ঘটনা ব্যতিক্রম। প্রতিবছর হাজারো শিশু নিখোঁজ হলেও অনেক পরিবার তাদের সন্তানের কোনো সন্ধান পায় না।
সম্প্রতি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সাত মাসে নিখোঁজ শিশুদের ঘটনায় প্রায় ১৬ হাজার জিডি হয়েছে।
এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, ১৩ হাজারের বেশি শিশু পরিবারের কাছে ফিরেছে। এখনো দুই হাজারের কিছু বেশি শিশু নিখোঁজ।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই সংখ্যাও বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ১৫ হাজার থেকে কমে দুই হাজার হয়েছে, এতে স্বস্তির কিছু নেই। দুই হাজার শিশুর জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে পারে না।’
তিনি বলেন, নিখোঁজ শিশু কোনো পরিসংখ্যান নয়।
ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘একটি শিশু শুধু একটি সংখ্যা নয়। নিখোঁজের ঘটনা পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কষ্টে ফেলে। বাবা-মা অসহায় হয়ে পড়েন।’
তার ভাষ্য, অপরাধী চক্র প্রায়ই নিখোঁজ শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি, মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করে।
টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রতিবছর হাজারো শিশু নিখোঁজ হয়। কিন্তু নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা ও উদ্ধারে কোনো সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা নেই।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার সাধারণত স্থানীয় থানায় জিডি করে। তবে শিশু অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, কিছু পরিবারকে অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। আবার অনেক পরিবার বলছে, অভিযোগের পর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে দেরি হয়।
নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন এমইউএন অ্যালার্ট বলছে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংগঠনটির মিডিয়া ও যোগাযোগ কর্মকর্তা মারুফ হায়াত বলেন, ‘অনেক পরিবার থানায় যাওয়ার পরও দ্রুত জিডি করতে পারে না। অথচ প্রথম ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
পরিবার, পুলিশ কর্মকর্তা ও শিশু অধিকারকর্মীরা জানান, অপহরণ বা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।
কক্সবাজারের উখিয়ায় অপহরণের অভিযোগের ১১ মাস পর ১৩ বছর বয়সী শফিকুল ও ১১ বছর বয়সী শহিদুলকে উদ্ধার করে পুলিশ।
চট্টগ্রাম থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর পাঁচ বছরেও সাইদুলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি কেন, জানতে চাইলে খুলশী থানার এক ডিউটি অফিসার বলেন, বর্তমান কর্মকর্তারা সবাই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যোগ দিয়েছেন। আগের ঘটনা সম্পর্কে তাদের কোনো তথ্য নেই।
ওই কর্মকর্তা বলেন, নিখোঁজ শিশুর অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ শিশুটির ছবি, বয়স, শারীরিক বর্ণনা ও সর্বশেষ অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা ও নিখোঁজের সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ করা হয়।
শিশুটি অন্য কোথাও চলে যেতে পারে বলে ধারণা হলে সংশ্লিষ্ট থানা ও পুলিশ ইউনিটকে তথ্য দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জিডির সংখ্যা একটি চলমান প্রবণতা তুলে ধরে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ঘটনায় ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছে। ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি ও ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি জিডি হয়।
পুলিশ জানায়, ছোট শিশুরা অনেক সময় পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিখোঁজ হয়। বড় শিশুরা পারিবারিক বিরোধ, পড়াশোনার চাপ, মানসিক অস্থিরতা বা বন্ধুদের প্রভাবে বাড়ি ছাড়তে পারে।
গত ছয় মাসে এমইউএন অ্যালার্ট ১ হাজার ২২৬টি নিখোঁজ শিশুর খবর পেয়েছে। এর মধ্যে ১৭১টি ঘটনায় সতর্কবার্তা জারি করেছে।
৮০০-এর বেশি শিশুকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৫ শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এখনো ৪১ শিশু নিখোঁজ।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, কিছু নিখোঁজ শিশু অপরাধ বা দুর্ঘটনার শিকার হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নিখোঁজের ঘটনাগুলো বিভিন্ন ধরনের। এর মধ্যে পরিবারের কাছ থেকে দুর্ঘটনাবশত বিচ্ছিন্ন হওয়া, স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হওয়া ও অপহরণের ঘটনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অভিযোগ পেলেই আমরা তদন্ত করি। এসব ঘটনা ঠেকাতে পরিবারের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।’
ইজাজুল ইসলাম বলেন, তদন্তে দেরি ও সমন্বয়ের ঘাটতিতে অনেক সময় নিখোঁজ শিশু দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘শিশু নিখোঁজ ও পাচার কমাতে সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। দ্রুত তদন্ত, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টাকে উদ্ধার অভিযানের ‘গোল্ডেন আওয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
তাদের মতে, দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, পুলিশ ইউনিটগুলোর সমন্বয় বাড়ানো, তাৎক্ষণিকভাবে জিডি গ্রহণ, সিসিটিভিভিত্তিক তদন্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
অভিভাবকদের জনসমাগমপূর্ণ স্থানে শিশুদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অনলাইনে অপরিচিতদের সঙ্গে শিশুদের যোগাযোগের বিষয়েও নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


