বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে সম্প্রীতির দেশ। এমন দাবি আমরা সবসময়ই করি। কিন্তু অনেক সময় এর বাস্তবতা মানুষের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। এর নানাবিধ কারণও রয়েছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল সবসময় ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে ব্যস্ত থাকে, যার ফলে দেশে কোনো না কোনো অজুহাতে অরাজক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। আর এর সুযোগ নেয় সেই বিশেষ মহলটি, যারা দেশের ভালো দেখতে চায় না। আসল কথা হলো, কোনো না কোনো কারণে আমাদের দেশে প্রায়ই একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা যায়। তবে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিচ্ছিন্ন কিছু অঘটন ছাড়া এবারের মতো এত শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা খুব কমই দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে।
বাঙালি সনাতন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হলো শারদীয় দুর্গাপূজা। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত পাঁচ দিন মূল উৎসব হলেও মহালয়া থেকেই এর আগমনী বার্তা শুরু হয়। শ্রী শ্রী চণ্ডী পাঠের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহনই মহালয়া হিসেবে পরিচিত। এই চণ্ডীতেই রয়েছে দেবী দুর্গার সৃষ্টির বর্ণনা এবং দেবীর প্রশস্তি। সে হিসেবে এবার ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়া উদযাপিত হয়। তার আগে মণ্ডপগুলোতে চলে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
আমি সংবাদের মানুষ হওয়ায় বেশ কিছুদিন আগে থেকেই কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলাম। কারণ, আমার অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। আর এই উদ্বেগের যৌক্তিকতাও ছিল। অন্যান্য বছর এই সময়টাতে অনেক অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সাক্ষী হতে হতো। অনেক সংবাদের মুখোমুখি হতে হতো, যা দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা একদম ভিন্ন। পুরো পূজার সময়টাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে হয়নি। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, আমাদের সারা দেশের প্রতিনিধিরা হয়তো কোনো কারণে অঘটনের সংবাদগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন। পরে অবশ্য সে ভুল ভেঙেছে। সংবাদক্ষেত্রের প্রচলিত ধারণা–‘খারাপ সংবাদই ভালো সংবাদ’। কিন্তু যা ঘটেনি, তার সংবাদ প্রতিনিধিরা কোথা থেকে দেবেন?
এবার আসি মূল কথায়। প্রথমেই বলি প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের কথা। এ বছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজায় অনুদান বাড়িয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্গাপূজার জন্য হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে চার কোটি টাকার অনুদান চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনায় বরাদ্দ দেওয়া হলো পাঁচ কোটি টাকা। তখনই একটি লেখা লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভাবলাম এটি তো কেবল শুরু, সামনে আরও পথ বাকি। তবে সেই যে প্রবাদ রয়েছে–‘সকালের সূর্য দেখলেই বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে।’ আশঙ্কা থাকলেও আশার আলো মনে তখন থেকেই গেঁথে গিয়েছিল, এবার দেশে অন্যরকম কিছু হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও তেমনি ছিল–কোথাও যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে।
এরপর আসা যাক সার্বিক আইনশৃঙ্খলার কথায়। শুরু থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব পর্যায়ের সদস্যরা ছিলেন অত্যন্ত তৎপর। কোথাও যেন কোনো অরাজক পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাই ছিলেন দারুণ আন্তরিক। আমাদের মতো দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাধারণ মানুষ একটু বেশিই সমালোচনা করেন। এর মূল কারণ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে না থাকা; পান থেকে চুন খসলেই দোষ গিয়ে পড়ে তার ওপর। কিছু করারও থাকে না, কারণ মানুষ অরাজকতায় অসহায় বোধ করে। যা-হোক, সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও কড়া নির্দেশনা ছিল। সে অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেন পুলিশের মহাপরিদর্শক। তিনি সনাতন, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। দেশের প্রায় ৩৪ হাজার পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিন লাখের বেশি সদস্য নিয়োজিত করা হয়।
এ বছর দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও সংঘাত-সহিংসতার ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। তবে এসব ঘটনায় করা ১১টি মামলায় দ্রুত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা মহানগরেই ছিল ২৫৮টি মণ্ডপ। যেসব স্থানে সামান্য কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলাই শ্রেয়।
পূজার নিরাপত্তা রক্ষায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২২ দফা নিরাপত্তা নির্দেশনা জারি করেছিল পূজা উদযাপন পরিষদ। এসব নির্দেশনার মধ্যে ছিল সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবী মোতায়েন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানো। বস্তুত, সরকার ও পূজা উদযাপন পরিষদের প্রস্তুতি ছিল সত্যিই চোখে পড়ার মতো।
পরিশেষে বলতে চাই, নিকট অতীতে দেশের মাটিতে এমন শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা আর কবে হয়েছে, তা কেউ সহজে স্মরণ করতে পারবে না। সেজন্য সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, পুলিশ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবার ভূমিকা অপরিসীম। আজ এটি প্রমাণিত, সবাই মিলে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে ভালো কিছু করা সম্ভব। তবে পূজায় নিরাপত্তা বজায় রাখাই শেষ কথা নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। সামনের দিনগুলোতে দেশ ও দেশের মানুষ যেন আরও নিরাপদে থাকতে পারে–এমন প্রত্যাশা রইল।


