শিক্ষকতাকে বলা হয় সব পেশার জননী। একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানই করেন না, বরং সমাজ ও মানুষের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে নেতৃত্ব দেন। সেই বিচারে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক মর্যাদা ও দায়িত্ব আরও অনন্য। বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে সমাজের প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি। কারণ, সেখানকার শিক্ষকদের কাজ কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নীতিনৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে দীক্ষিত করা।
অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নানা জায়গায় কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশু নিগ্রহ, পীড়ন ও বলাৎকারের মতো বীভৎস অপরাধের ঘটনা বারবার আলোচনায় আসছে। যে স্থানটি হওয়ার কথা ছিল শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সেখানেই যদি তাদের জীবনে অবর্ণনীয় দুর্দশা নেমে আসে, তবে তা পুরো সমাজকে এক গভীর স্থবিরতা ও আশঙ্কার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া তেমনই একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সুগভীর চিন্তার খোরাক জোগায়। মাত্র ছয় বছরের একটি নিষ্পাপ শিশু তার মাদ্রাসা শিক্ষকের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ঘটনাটি জানার পর পরম ক্ষোভ ও বেদনায় শিশুটির বাবা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ওই শিক্ষককে সজোরে চড় মারেন এবং শারীরিকভাবে প্রহার করেন।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এক সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে সমর্থন করি না। সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে অপরাধের বিচার প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের মাধ্যমেই হওয়া উচিত—এটাই একটি সভ্য দেশের মূল ভিত্তি।
কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি চরম সত্যকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। আইনি নীতি ও নাগরিক কর্তব্যের ঊর্ধ্বে উঠে যদি একজন বাবার জায়গা থেকে বিষয়টি অনুধাবন করি, তবে স্বীকার করতেই হয়—ওই বাবার জায়গায় আমি থাকলেও হয়তো মুহূর্তে আইনের শাসনের কথা ভুলে যেতাম। পিতৃত্বের তীব্র বেদনা ও ক্ষোভের আগুনে জ্বলে হয়তো অপরাধীকে নিজ হাতেই শাস্তি দিতাম, আর তার পরিণতি হিসেবে প্রচলিত আইন আমাকে যে শাস্তি দিত, তা মাথা পেতে মেনে নিতাম।
শিক্ষকের স্থান শ্রদ্ধার আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আস্থার প্রতীক। যখন এই দুটি জায়গায় বিকৃত মানসিকতা প্রবেশ করে, তখন তা কেবল একটি শিশুর জীবন ধ্বংস করে না, বরং গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের ভরসাকে চুরমার করে দেয়। সমাজের সুশীল ও সচেতন শ্রেণি যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনি পদক্ষেপ ও জবাবদিহিতার কথা বলেন, সেখানে সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীর পরিবার অনেক সময় দীর্ঘসূত্রী বিচার ব্যবস্থার শঙ্কায় তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশকে একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয়। বিচারহীনতার ভয়ই মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করে।
একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আইনের প্রতি আনুগত্য দেখানো আমার কর্তব্য, আবার একজন বাবা হিসেবে সন্তানের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষা করা আমার আদিম ও মৌলিক অনুভূতির বিষয়। আমি যেমন এই রাষ্ট্রের একজন নিয়ম মেনে চলা নাগরিক, তেমনি একজন সন্তানের সুরক্ষাকারী পিতাও। দুটি পরিচয়ই আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ও অর্থবহ।
কিন্তু যখন পিতৃত্বের তীব্র আবেগ ও অসহায়ত্ব সামাজিক সচেতনতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন তা কেবল কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা প্রকাশ করে না, বরং তা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার সংকটের দিকেই আঙুল তোলে।
একটি সভ্য ও নিরাপদ সমাজ গঠনে আইনি বিচার ব্যবস্থার দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। পিতৃত্বের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ ও আইন মানার নাগরিক দায়িত্ব—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে ফুটে উঠেছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক চরম বাস্তবতা। অর্থাৎ সন্তানকে রক্ষার আকুতি একজন বাবার মৌলিক অধিকার ও দায়িত্ব হলেও, আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে নৈরাজ্য ডেকে আনে।
তাই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে অপরাধীর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অভিভাবককে নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে না হয়। পাশাপাশি শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে কঠোর তদারকি, শিক্ষকদের মনস্তাত্ত্বিক পটভূমি যাচাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
নিষ্পাপ শিশুদের বিকাশ ও নিরাপত্তার স্বার্থে রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে, যেন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর ভয়ের কারণ না হয়ে ওঠে, বরং শিশুদের জন্য সর্বাধিক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।
লেখক: শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, ঢাকা


