একবার ভাবুন তো- হাজার বছর আগের সেই কথিত পৌরাণিক দুনিয়ায় যদি আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল কিংবা ইনস্ট্যান্ট মেসেজিংয়ের ব্যবস্থা থাকত, দেবতাদের ইনবক্সের অবস্থা কেমন হতো? অসুরদের দাপট যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন নিশ্চয়ই একের পর এক জরুরি বৈঠকের ডাক পড়ত। পুরাণের গল্পটি আমাদের চমকে দেয়। কোনো একক দেবতার হাতে কখনোই সমস্যার সমাধান ছিল না। প্রত্যেকে নিজের শক্তি, অস্ত্র ও সামর্থ্য একত্র করলেন। সেই সম্মিলিত শক্তিরই পৌরাণিক রূপ- দুর্গা।
গল্পটিকে নিছক অলৌকিক কাহিনি হিসেবে না পড়ে যদি সামাজিক যোগাযোগ ও মানুষের সম্মিলিত আচরণের দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে এখানে এক আশ্চর্য আধুনিকতা চোখে পড়ে। সংকট যখন একার সাধ্যের বাইরে চলে যায়, তখন মানুষকে একত্র হতে হয়- নিজের শক্তিকে অন্যের শক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় সম্মিলিত উদ্যোগ বা কালেক্টিভ একশন। পুরাণের দেবতারা অবশ্য সমাজবিজ্ঞানের কোনো বই পড়েননি; কিন্তু তাঁদের কাহিনি আমাদের সেই পুরোনো সত্যটিই মনে করিয়ে দেয়- বড় সংকটের মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন শক্তি নয়, সম্মিলিত শক্তিই কার্যকর হয়ে ওঠে।
আরও মজার বিষয় হলো, দুর্গার জন্মকাহিনিকে আমরা চাইলে এক ধরনের পৌরাণিক ‘সম্মিলিত সৃষ্টির’ গল্প হিসেবেও পড়তে পারি। দেবতারা তাঁদের নিজ নিজ শক্তি সমর্পণ করছেন; সেই বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলো একত্র হয়ে তৈরি করছে এক নতুন সত্তা। এখানে দেবী যেন শুধু একজন অতিমানবীয় চরিত্র নন; তিনি বহু শক্তির সমন্বিত প্রকাশ। এই পাঠে দুর্গা হয়ে ওঠেন সহযোগিতা, সমন্বয় ও সম্মিলিত সক্ষমতার এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। দুর্গা যেহেতু হিমালয়কন্যা, তাই তিনি ‘হিমালয়দুহিতা’; পরিচয়টাও বেশ মজার- এখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণিই যেন হয়ে যায় এক বাবার ভিটার নাম! ভাবুন তো, আজকের দিনে এমন পরিচয় হলে বায়োতে হয়তো লেখা থাকত- ‘বাবা: হিমালয়; বাড়ি: কৈলাস!’ আর বিয়ের পর ঠিকানা বদলালেও বাপের বাড়ির সেই উচ্চতা কিন্তু আর কারও নেই!
দেবীর সঙ্গে থাকা প্রাণী ও প্রতীকগুলোর দিকেও একবার তাকানো যাক। সিংহ, ইঁদুর, ময়ূর, পেঁচা, সাপ- বাংলার দুর্গাপূজার দৃশ্যভাষায় নানা প্রাণী ও উদ্ভিদ পাশাপাশি উপস্থিত হয়। দেবীর প্রতিমার চারপাশে যেন এক ক্ষুদ্র জীবজগৎও নির্মিত হয়। বাস্তব প্রকৃতিতে এদের সম্পর্ক অবশ্য এতটা শান্তিপূর্ণ নয়; ইঁদুর সিংহের পাশে বসে নিশ্চিন্তে সহাবস্থান করে না। তাই এটিকে আক্ষরিক পরিবেশবিজ্ঞানের পাঠ হিসেবে না দেখে একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে পড়াই বোধহয় বেশি আকর্ষণীয়। মানুষ তার কল্পনায় এমন একটি জগৎ নির্মাণ করেছে, যেখানে পরস্পর ভিন্ন, এমনকি পরস্পরের সম্ভাব্য শিকার ও প্রতিপক্ষ প্রাণীরাও একই দৃশ্যের মধ্যে পাশাপাশি থাকতে পারে।
এই কল্পনাটিই আমাদের ভাবায়। মানুষ কি এমন একটি সমাজ কল্পনা করতে পারে না, যেখানে ভিন্নতা মানেই শত্রুতা নয়? যেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল, বড় ও ছোট, ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ একই জনপরিসরে সহাবস্থান করতে পারে? পুরাণের এই দৃশ্যকে আধুনিক পরিবেশ-নৈতিকতার সরাসরি ‘বার্তা’ বলা হয়তো বাড়াবাড়ি হবে; কিন্তু সহাবস্থানের একটি সাংস্কৃতিক কল্পনা হিসেবে এর পাঠ নিঃসন্দেহে সম্ভব।
এবার আসা যাক মহিষাসুরের কাছে। এখানেই পুরাণ পাঠের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। প্রচলিত শাক্ত পুরাণকথায় মহিষাসুর দেবতাদের পরাজিত করে ক্ষমতা দখলকারী এক শক্তিশালী অসুর; দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত দুর্গার সঙ্গে তাঁর সংঘাত এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর পরাজয়ই কাহিনির কেন্দ্র। এই আখ্যানের ধর্মীয় পাঠে দুর্গার বিজয় তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। কিন্তু একজন পুরাণ-অনুসন্ধিৎসুর প্রশ্ন এখানেই শেষ হয় না; বরং এখান থেকেই শুরু হয়।
মহিষাসুরকে শুধু ‘অশুভের প্রতীক’ বলে থেমে গেলে তাঁর সাংস্কৃতিক অর্থের অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। ‘অসুর’ শব্দটির নিজস্ব দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং বৈদিক সাহিত্য থেকে পরবর্তী পুরাণে তার অর্থও একরকম ছিল না। দেব ও অসুরের সম্পর্ককেও সব সময় আজকের সরল ‘ভালো বনাম মন্দ’ ছকে বোঝা যায় না। ফলে মহিষাসুরকে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- একজন চরিত্রকে কোন প্রক্রিয়ায় ‘দেব’ এবং অন্যজনকে ‘অসুর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, এবং সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয়ের অর্থ কীভাবে বদলায়?
এর মানে অবশ্যই এই নয় যে প্রচলিত কাহিনির বিপরীতে মহিষাসুরকে ‘নায়ক’ বানিয়ে দিতে হবে। বরং তাঁকে একটি বহুস্তরীয় পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে দেখা যায়। তাঁর শক্তি, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, দেবতাদের সঙ্গে সংঘাত, মানব-মহিষের মিশ্র অবয়ব- সব মিলিয়ে তাঁর চরিত্রে পৌরাণিক কল্পনার নানা স্তর কাজ করে। একদিকে তিনি দেবীর প্রতিপক্ষ; অন্যদিকে তাঁর উপস্থিতিই দুর্গার কাহিনিকে অর্থবহ করে তোলে। অর্থাৎ মহিষাসুরকে বাদ দিয়ে দুর্গার এই নির্দিষ্ট পৌরাণিক রূপটিও সম্পূর্ণ হয় না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহিষাসুরকে ঘিরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একরকম স্মৃতি বা ব্যাখ্যা নেই। কোথাও তিনি প্রচলিত পুরাণের পরাজিত অসুর, আবার কোথাও তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভিন্ন লোকস্মৃতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও বিকল্প ব্যাখ্যা। এই বৈচিত্র্য আমাদের কোনো একটি পাঠকে চূড়ান্ত সত্য ঘোষণা করার বদলে প্রশ্ন করতে শেখায়- একই পৌরাণিক চরিত্রকে ভিন্ন জনগোষ্ঠী কেন ভিন্নভাবে মনে রাখে? কার কাছে তিনি প্রতিপক্ষ, কার কাছে পূর্বপুরুষসদৃশ স্মৃতির অংশ, আর কার কাছে নিছক পৌরাণিক চরিত্র?
যোগাযোগবিদ্যার দৃষ্টিতে এখানেই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো সমাজ শুধু গল্প বলে না; গল্পের মধ্য দিয়ে নিজের মূল্যবোধ, পরিচয় ও স্মৃতিও নির্মাণ করে। ফলে কে নায়ক, কে প্রতিপক্ষ, কার কণ্ঠ সামনে থাকবে আর কার কণ্ঠ প্রান্তে থাকবে- এসবও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের অংশ। মহিষাসুরের ক্ষেত্রে তাই শুধু ‘তিনি ভালো না খারাপ’- এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হতে পারে: তাঁকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, কে সেই উপস্থাপন তৈরি করেছে, এবং অন্য কোনো পাঠের সুযোগ সেখানে কতটা রয়েছে?
এই জায়গায় একটি সতর্কতাও জরুরি। মহিষাসুরের বিকল্প সাংস্কৃতিক পাঠকে স্বীকার করা মানেই প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয়। আবার প্রচলিত ধর্মীয় আখ্যানকে সম্মান করা মানেই বিকল্প স্মৃতি বা ব্যাখ্যাগুলোকে অগ্রাহ্য করা নয়। একটি বহুত্ববাদী সমাজে একই পৌরাণিক চরিত্রকে ঘিরে একাধিক স্মৃতি ও ব্যাখ্যা পাশাপাশি থাকতে পারে। আন্তঃধর্মীয় অধ্যয়নের সৌন্দর্যও এখানেই- কোনো একটি পাঠকে মুছে না দিয়ে বিভিন্ন পাঠের সহাবস্থান বোঝার চেষ্টা করা।
তাই সমকালীন সমাজে ‘মহিষাসুর’ খুঁজতে গেলে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষকে চিহ্নিত করা উচিত নয়। পৌরাণিক চরিত্রকে বাস্তব মানুষের ওপর চাপিয়ে দিলে পুরাণের অনুসন্ধানী সম্ভাবনা বরং সংকুচিত হয়। বরং মহিষাসুরের কাহিনি আমাদের ক্ষমতা, আধিপত্য, সংঘাত এবং ‘অপর’ নির্মাণের প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবতে পারে। একই সঙ্গে আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে- যে কোনো সংঘাতের কাহিনিতে বিজয়ীর পাশাপাশি পরাজিত পক্ষের স্মৃতিও থাকে।
এই দ্বৈততাই হয়তো মহিষাসুরকে আকর্ষণীয় করে তোলে। তিনি শুধু দেবীর হাতে পরাজিত এক পৌরাণিক চরিত্র নন; তিনি এমন একটি প্রশ্নের দরজাও খুলে দেন- একটি সমাজ যখন কাউকে ‘অসুর’ বলে চিহ্নিত করে, তখন সেই নামকরণের মধ্য দিয়ে সে নিজের সম্পর্কে কী বলছে?
এই জায়গায় পুরাণ আমাদের সমকালীন সমাজের দিকে একটি আয়না ধরতে পারে। আজ ধর্মের নামে হিংসা, পরিচয়ের নামে বিভাজন, মতের অমিলকে শত্রুতায় পরিণত করা কিংবা নিজের বিশ্বাসকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা যখন দেখা যায়, তখন ‘অসুর’কে কোনো মানুষের মুখে খুঁজে বের করার চেয়ে আসুরিক প্রবৃত্তিকে আমাদের আচরণে খোঁজা অনেক বেশি অর্থবহ। আর তার সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন জুড়ে দেওয়া জরুরি- আমরা কাকে ‘অপর’ বানাচ্ছি, কেন বানাচ্ছি, এবং তার গল্পটি শুনতে কতটা প্রস্তুত?
দুর্গাপূজার সামাজিক সৌন্দর্য এখানেই। মণ্ডপে ঢুকলে কেউ শুধু পূজার আচার দেখতে যায় না। কেউ প্রতিমা দেখে, কেউ আলোকসজ্জা, কেউ শিল্পকর্ম, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে, কেউ খাবারের দোকানে দাঁড়ায়, কেউ রাতভর শহর ঘুরে বেড়ায়। ধর্মীয় আচারের সঙ্গে মিশে যায় নাগরিক জীবন, শিল্প, অর্থনীতি, বিনোদন, স্মৃতি ও সম্পর্ক। পূজামণ্ডপ তখন হয়ে ওঠে এক অস্থায়ী জনপরিসর- যেখানে বহু ধরনের মানুষ একই উৎসবের দৃশ্যের অংশ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই ‘শারদীয়া উৎসব’ কথাটির মধ্যে একটি গভীর সামাজিক অর্থ আছে। দুর্গাপূজা শুধু পূজার দিনগুলোর আচার নয়; এটি একটি সামষ্টিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এখানে মানুষ একে অপরকে দেখে, কথা বলে, খায়, ঘোরে, ছবি তোলে, স্মৃতি তৈরি করে। এক অর্থে এটি সমাজের নিজের সঙ্গে নিজের যোগাযোগেরও একটি বার্ষিক আয়োজন।
তাই মণ্ডপের আলো, ঢাকের শব্দ কিংবা ধুনুচির নাচের আনন্দকে শুধু ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে আটকে রাখলে উৎসবটির সামাজিক বিস্তারটি ধরা পড়ে না। একই টেবিলে অপরিচিত মানুষের পাশে বসে খাবার খাওয়া, বন্ধুর সঙ্গে রাত জাগা, প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হওয়া, অন্যের শিল্পকর্ম দেখে মুগ্ধ হওয়া- এসবও উৎসবের যোগাযোগ।
শেষ পর্যন্ত দুর্গার আবাহন হয়তো আমাদের কোনো সরল নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য নয়। বরং একটি পুরোনো কাহিনিকে প্রতি বছর নতুন করে পড়ার সুযোগ দেয়। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে দেবীর জন্ম আমাদের সহযোগিতার কথা ভাবায়; দেবী ও অসুরের সংঘাত আমাদের ক্ষমতা ও ‘অপর’-এর নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়; আর পূজার জনপরিসর আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একটি সমাজ শুধু বিশ্বাসে নয়, পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যেও তৈরি হয়।
পুরাণ তাই অতীতের কাঠখোট্টা গল্প নয়। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক আয়না, যাতে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের সময়টাকেও দেখতে পারি। সেখানে দুর্গা আছেন, মহিষাসুরও আছেন; বিজয়ের কাহিনি আছে, আবার পরাজিতের নীরবতাও আছে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই আয়নায় শুধু নিজের পছন্দের ছবিটাই দেখব, নাকি একটু গভীরভাবে তাকিয়ে পুরো দৃশ্যটিকে পড়ব?
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


