শিক্ষকতা পেশায় প্রয়োজন জাতীয় ও বৈশ্বিক আত্মপর্যালোচনা

শিক্ষকতা পেশায় প্রয়োজন জাতীয় ও বৈশ্বিক আত্মপর্যালোচনা
Advertisement
Advertisement

সম্প্রতি পালিত হলো বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিবসটি পালিত হয়। বর্তমান সরকার বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের নানামুখী কার্যক্রম নেন। এই দিবসে শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি  শিক্ষকতার পেশার মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশের সৃষ্টি করা।

দিবসটি শুধু শিক্ষকদের সম্মান জানানোর আনুষ্ঠানিক দিন নয়; বরং শিক্ষকতা পেশার অবস্থান, অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের কণ্ঠস্বর নিয়ে নতুন করে ভাবার আন্তর্জাতিক উপলক্ষ্য। ৫ অক্টোবর ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো এবং আইএলও যৌথভাবে ‘রিকমেন্ডেশন কনসার্নিং দি স্ট্যাটাস অব টিচারস’ গ্রহণ করে। এই সুপারিশপত্রে শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, নিয়োগ, কর্মপরিবেশ, পেশাগত উন্নয়ন, বেতন এবং শিক্ষাদানের পরিবেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়।

শিক্ষককে কেবল পাঠদানকারী ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একজন পেশাজীবী এবং শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৯৬৬ সালের সুপারিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। এই ঐতিহাসিক সুপারিশ গ্রহণের দিনটিকে স্মরণ করে ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসটির প্রয়োজনীয়তা কেবল আবেগ বা আনুষ্ঠানিকতার ওপর নির্ভরশীল নয়; এর পেছনে রয়েছে বাস্তবতা  ও সামাজিক প্রয়োজন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার মান শিক্ষকের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের কেবল ভালো পাঠ্যপুস্তক, প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামো উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়। মেধাবী, দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল শিক্ষক প্রয়োজন। ইউনেস্কো শিক্ষকদের মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি  শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও পেশাগত মর্যাদাকে গুরুত্ব দেয়।

তাছাড়া, শিক্ষক সংকট ও পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক এক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৪ মিলিয়ন শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। তাই শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের শুধু সম্মান জানানোর পরিবর্তে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম উন্নয়নে শিক্ষককে অংশীদার করার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের সমাজে শিক্ষকতার পেশায় মর্যাদা লক্ষ্য করা যায় না। যদিও বলা হয় শিক্ষকতা চাকরি নয়, এটি মহান পেশা। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম বেতন পায় আমাদের দেশের শিক্ষক সমাজ। শিক্ষকদের মহান পেশার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষকদের সামাজিক, পেশাগত ও নৈতিক মর্যাদা পুনর্বিবেচনা করা।

আমাদের জনবহুল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল দেশে শিক্ষক দিবসের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। শিক্ষক ঐতিহাসিকভাবে জ্ঞান, নৈতিকতা ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। এ দিবসে শিক্ষকদের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে। কেবলমাত্র ফুল বা ক্রেস্ট দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যেই দিবসটির কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ থাকা নিছক বাতুলতা।

আরও পড়ুন

এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত- শিক্ষকরা  পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা,কর্মপরিবেশ, শিক্ষকের মতামত শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেদিকেই বিবেচনা নিতে হবে। বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম যতই আধুনিক হোক, তার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের প্রয়োগক্ষমতার ওপর। বিশেষ করে দক্ষতাভিত্তিক, অভিজ্ঞতাভিত্তিক, সৃজনশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষককে শুধু পাঠদানকারী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁকে হতে হবে মেন্টর। বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে বাস্তব ফলপ্রসূ করতে হলে বাংলাদেশে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষকদের জন্য এককালীন প্রশিক্ষণের পরিবর্তে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পাঠ্যপুস্তক তৈরি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করা। শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন প্লাটফর্ম এবং শিক্ষাতথ্য প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষককে প্রস্তুত করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক উন্নয়ন, ভালো কাজের স্বীকৃতি প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষককে শুধু পাঠদান নয়, গবেষণা ও নতুন জ্ঞানসৃষ্টির সঙ্গেও যুক্ত রাখতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষক দিবসে শিক্ষককে শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষকতা পেশার মান, পেশাগত উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণী কাজে অংশগ্রহণ ও ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কীভাবে সামনে এগুতে হবে তা নির্ধারণ করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করা।

আমাদের দেশে  শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ,  দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত পদ্ধতি নির্বাচনে শিক্ষকের প্রয়োজন পেশাগত স্বাধীনতা।

শিক্ষানীতি প্রণয়নে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতের অন্তর্ভুক্তির বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাছাড়া,  ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে শিক্ষকতার নতুন ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমির, প্রান্তিক শিক্ষার্থী ও এথনিক সম্প্রদায়ের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার এটাই মোক্ষম সময়।

একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষকের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে পরিবর্তিত হয়েছে। আগে শিক্ষক ছিলেন মূলত জ্ঞান সরবরাহকারী। এ সময়ের শিক্ষার্থীরা মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেট, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও এআই-এর মাধ্যমে বিপুল তথ্য সহজেই পেতে পারে। ফলে শিক্ষকের গুরুত্ব কমেনি; বরং শিক্ষকের ভূমিকা আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে।

এই কারণেই এ সময় শুধু শিক্ষককে ধন্যবাদ জানানোর দিন নয়; ভবিষ্যতের শিক্ষক কেমন হবেন এবং ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত—এই প্রশ্নের সময়। ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এটি ১৯৬৬ সালের ইউনেস্কো, আইএলও-এর ৬০তম বার্ষিকী। ইউনেস্কো এ বছর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষকতার পেশার মর্যাদা রক্ষা ও অগ্রসর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল ভাবনা, শিক্ষককে শুধু অতীতের জ্ঞান সংরক্ষণকারী হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা। শিক্ষককে সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক সম্মান প্রদান করার পাশাপাশি, শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার একটি দিন। একজন ভালো শিক্ষক তৈরি হয় শুধু ব্যক্তিগত মেধা দিয়ে নয়; প্রয়োজন মানসম্মত প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই  শিক্ষক দিবসের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন ৫ অক্টোবরের আনুষ্ঠানিকতা সারা বছরের শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হবে। অতএব এ দিবসটি কেবল শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন নয়; এটি কেমন শিক্ষক চাই, কেমন শিক্ষা চাই এবং কেমন সমাজ গড়তে চাই—তারও একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক আত্মপর্যালোচনার দিন।

লেখক: ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad