আত্মবিস্মৃতির আড়ালেই লুকিয়ে মানুষের আত্মশক্তি

আত্মবিস্মৃতির আড়ালেই লুকিয়ে মানুষের আত্মশক্তি
আক্তার খান মুকুল
Advertisement
Advertisement

আত্মবিস্মৃতি মানেই শুধু নিজের নাম, পরিচয় বা অতীত ভুলে যাওয়াকে বোঝায় না। মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট তার দারিদ্র্যতা, প্রতিকূলতা কিংবা ব্যর্থতাও নয়; বরং নিজের অন্তর্নিহিত শক্তি, মর্যাদা ও সম্ভাবনাকে ভুলে থাকা। এই আত্মবিস্মৃতি মানুষকে তার প্রকৃত সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তাকে অন্যের উপর নির্ভরতা, অনুকরণপ্রিয়তা, নিষ্ক্রিয়তা সবশেষে নিরাশ জীবনে তাকে আবদ্ধ করে তোলে।

মানুষ পৃথিবীতে আসে এক  অপার সম্ভাবনা নিয়ে অথচ সে নিজের অজান্তেই সেসব  ভুলতে বসে, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই আত্মমর্যাদা, আত্মপরিচয়, আত্মশক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি বিদ্যমান। যে সকল মানুষ নিজের অমিয় সম্ভাবনার খোঁজে সতত অনুসন্ধিৎসু নয়, সে ধীরে ধীরে প্রত্যয়হীন, স্বপ্নহীন এক শূন্যতার দিকে ধাবমান হয়।

কবি আল্লামা  ইকবাল বলেন, এই বিস্মৃতির আড়ালেই মানুষের মধ্যে সুপ্ত রয়েছে এক অসীম সম্ভাবনা। তাঁর মতে, মানুষ যখন নিজের ‘খুদি’কে চিনতে পারে এবং তাকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে বিকশিত করে, তখন সে কেবল নিজের জীবনই পরিবর্তন করে না; বরং সমাজ ও সভ্যতার আমূল পরিবর্তনেরও সক্রিয় শক্তিতে পরিণত হয়। মানুষ প্রথমে নিজের শক্তি সম্পর্কে অসচেতন থাকতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, আত্মসংযম, কর্ম, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে সে নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারে।

যারা চিনতে শেখে তাদের মধ্যে কেউ কেউ সংকটের সময় মানুষকে  নতুন পথ দেখাতে সক্ষম হন। তাঁরা নতুন ধারণা,  মূল্যবোধ বা নেতৃত্বের মাধ্যমে সমাজকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।আরও বলা যায়, সংকটের সময়ে মানুষ বস্তুগত ও রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে অর্থনৈতিক ও নৈতিক দৃঢ়তা খুঁজে পায়।

আত্মবিস্মৃত ব্যক্তি  নিজের সম্ভাবনা ও দায়িত্ব ভুলে গিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তেমনি আত্মবিস্মৃত সমাজে তার সৃজনশীল শক্তি ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব ভুলে যেতে পারে। সে তখন পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না, সৃজনশীল নেতৃত্ব হারায়, কেবল পুরোনো ধ্যানমগ্নতায় নিবিষ্ট হয়ে  আঁকড়ে থাকে।

মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি অনেক সময় তার নিজের কাছেই অজ্ঞাত থাকে। মানুষ নিজেকে যতটুকু জানে, তার প্রকৃত সামর্থ্য অনেক সময় তার চেয়েও বহুগুণ বেশি। প্রতিকূলতা, অবহেলা, ব্যর্থতা কিংবা অন্যের নেতিবাচক মূল্যায়নের আড়ালে সেই শক্তি অনেক সময় সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে। সে সময় প্রয়োজন হয় এমন একজন মানুষের, যিনি সেই সুপ্ত শক্তিকে চিনতে পারেন এবং মানুষটির নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারেন।

একটি প্রচলিত কাহিনীর কথা দিয়ে মানুষের আত্মবিস্মৃতির আড়ালে যে বিরাট শক্তি সুপ্তাবস্থায় লুকিয়ে থাকে তার দৃষ্টান্তের কথা আমার মনে পড়ে গেল।  বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস এডিসনের ক্ষেত্রে তাঁর মা সেই ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিক্ষক তাঁকে বিদ্যালয়ের জন্য অনুপযুক্ত মনে করলেও তাঁর মা সন্তানের সামনে সেই নেতিবাচক মূল্যায়ন তুলে ধরেননি। বরং তিনি এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন, যাতে শিশুটির মনে জন্ম নেয়—‘আমার মধ্যে বিশেষ কিছু আছে; আমাকে আরও ভালোভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ প্রয়োজন।’

একজন মানুষ আজ যেমন, সে শুধু ততটুকুই নয়; তার মধ্যে আগামী দিনের আরও বড় একজন মানুষ সুপ্ত থাকে যা সে পারিপার্শ্বিকতার কারণেই হোক, কিংবা মানুষের নেতিবাচক কথা  অথবা অবজ্ঞার কারণে অনেক সময় মানুষের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা নিষ্ক্রিয় হয়ে সে একজন আত্মপ্রত্যয়হীন, আত্মবিশ্বাসহীন মানুষে পরিণত হয়। এই আত্মপ্রত্যয়হীন মানুষকে দরকার একটু অনুপ্রেরণা যা তাকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে। মানুষ একা সব সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে না। পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু ও সমাজের ইতিবাচক সহায়তা বিশেষভাবে প্রয়োজন। শুধু ‘তুমি পারবে’ বললে মানুষের সম্ভাবনা জাগে না। প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা ও আত্মশক্তি তৈরি করা। এ আত্মশক্তির ফলে মানুষের মধ্যে আত্মজাগরণ সৃষ্টি হয়। আত্মজাগরণের ফলে মানুষ  নিজের আত্মপরিচয়কে সম্পদের কাছে সমর্পণ করে না।

আরও পড়ুন

মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অনেক সময় তার বাহ্যিক সীমাবদ্ধতা নয়; বরং নিজের ভেতরে থাকা শক্তি, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা।  যখন নিজের মর্যাদা, দায়িত্ব ও সামর্থ্য ভুলে যায়, তখন সে আত্মবিস্মৃতির মধ্যে প্রবেশ করে। এর ফলে ভয়, হতাশা, অলসতা,পরনির্ভরতা ও উদ্দেশ্যহীনতা তাকে গ্রাস করতে থাকে। একজন মানুষ যত বেশি গভীরভাবে চিন্তা করবে, সে তত বেশি নিজের আত্মশক্তি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।

গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস যথার্থই বলেন, নিজেকে জানো, আর এ জানাই নিজের আত্মপরিচয়কে জানা। নিজের শক্তি সম্পর্কে জানা, আত্মজাগরণ সম্পর্কে জানা। মানুষ কীভাবে নিজের সুপ্ত শক্তিকে আবিষ্কার করবে এবং সেই শক্তিকে ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতার কল্যাণে নিয়োজিত করবে? এ প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনুকরণ প্রিয় না হয়ে, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস আর প্রত্যয় জন্মানোর মধ্যদিয়ে আত্মজাগরণ সৃষ্টি করা সম্ভব।

একজন মানুষের জ্ঞান থাকতে পারে, কিন্তু সে যদি নিজের জ্ঞানকে কাজে ব্যবহার না করে, তাহলে তার সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে। কিংবা একজন তরুণের প্রতিভা থাকতে পারে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাবে সে যদি চেষ্টা না করে, তাহলে সেই প্রতিভা বিকশিত  হয় না। প্রত্যেক যুগেই  সমাজের সম্পদের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু সুশিক্ষা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার অভাবে সেই সম্পদ যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত না হয়, তবে তার সম্ভাবনাও সুপ্ত থেকে যায়। সুতরাং আত্মবিস্মৃতি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও সভ্যতাগত সমস্যাতেও পরিণত হতে পারে। মানুষ ও সভ্যতা তখনই এগিয়ে যায়, যখন তারা নিজেদের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে প্রতিকূলতার প্রতি সৃজনশীল ও নৈতিক প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয়।

মানব সভ্যতায় পুর্নজাগরণের চেয়ে আধ্যাত্মিক জাগরণ বিশেষভাবে প্রয়োজন। মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের চেতনার পরিবর্তন। তিনি এমন মানুষ তৈরি করেছিলেন যারা শুধু তথ্যই জানত না, বরং জানাকে চরিত্র ও কর্মে রূপান্তর করতে পারত। শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই আত্মশক্তি তৈরি হয় না। জ্ঞানকে নৈতিকতা ও কর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। একই সঙ্গে আত্মসংযমও অপরিহার্য। যে ব্যক্তি নিজের রাগ, লোভ, ভয়, অহংকার ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তার বাহ্যিক ক্ষমতা থাকলেও প্রকৃত আত্মশক্তি দুর্বল হতে পারে। মানুষ যেন নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনতে শেখে এবং নিষ্ক্রিয় থেকে কেবল অদৃষ্টবাদে  আবদ্ধ না থাকে।

মানুষ যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে সংগ্রাম করে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারাই নিজের আত্মশক্তি জানান দেয়া। আত্মবিস্মৃত মানুষ মনে করে আমি পারিনা, কিন্তু একজন আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ মনে করে, আমার মধ্যে সম্ভাবনা আছে; আমাকে তা বিকশিত করতে হবে।

যারা ভাবতে শেখে, শুধু স্বপ্ন দেখলেই সম্ভাবনা বাস্তব হয় না। নিয়মিত শ্রম, আত্মসংযম ও অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বকে শক্তিশালী করতে হয়। তারাই কেবল নিজের ভেতরের শক্তিটাকে ভালোভাবে বুঝতে শেখে এবং এক পর্যায় সে নিজের মধ্যে সুপ্ত থাকা অফুরন্ত শক্তির খুঁজে পায়, তখন তার মধ্যে আত্মজাগরণ শুরু হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে আত্মশক্তি কর্মে প্রকাশ পেতে শুরু হয়। তখন নতুন চিন্তা করতে শুরু করে , সমস্যা সমাধান করতে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে  এবং সমাজে অবদান রাখতে শুরু করে।

বর্তমান এ বৈশ্বিক যুগে আমরা বস্তুটাকে সবকিছু মনে করি, এমনকি মানুষের আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসাও বস্তু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে কেউ কেউ অনেক বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে,  সমাজে প্রতিযোগিতা করে অনেক সম্পদ অর্জন করে ঠিকই, প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী নয়।

আমাদের দেশের অভিভাবকরা যেভাবে তাদের সন্তানদের জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় যেভাবে তাদের সন্তানদের অবতীর্ণ করছে, এতে তাদের হয়ত ডিগ্রি অর্জন হয়, কিন্তু তাদের অনেকেই তার প্রকৃত আত্মশক্তি কিংবা আত্মজাগরণ সম্পর্কে এক্কেবারে সুপ্তই থেকে যায়। অধিকাংশ  অভিভাবকই অনেক কিছু জোর করে চাপিয়ে দেয় এবং বড় বড় ডিগ্রি নেয়ার ব্যাপারে এতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। আবার অনেকে নানান অনুশাসন দিয়ে তাদের সুপ্ত প্রতিভা সম্পর্কে অন্ধই থেকে যায়।

আমরা মূল্যবোধের শিক্ষায় অনেকটাই নিশ্চুপ থেকে যাই, ফলে বোধহীন, আত্মপ্রত্যয়হীন, আত্মশক্তিহীন এমন প্রজন্ম সৃষ্টি করে চলেছি, তাদের মধ্যে আত্মজাগরণের দীপ্যমান শিখা প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে না।

আমাদের ভেতরের মানুষটির মাঝে যে অমিয় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে তা স্ফুরণ ঘটাতে নিজের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টির উন্মাদনা থাকতে হবে, আমি পারবো কারণ আমার মাঝে এক অফুরন্ত সম্ভাবনা আছে, যাকে কাজে লাগিয়ে আমি ঈপ্সিত লক্ষে পৌঁছে যাব। চূড়ান্ত আত্মশক্তি হলো এমন শক্তি, যা শুধু ব্যক্তির উন্নতি নয়, অন্য মানুষের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

সুতরাং আমাদের ছেলেমেয়েদের শুধু পরীক্ষার ফলাফলের জন্য প্রস্তুত না করে তাকে চিন্তাশীল, আত্মবিশ্বাসী, নৈতিক ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বাহ্যিক সম্পদ নয়; তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা। কিন্তু সম্ভাবনা নিজে নিজে বাস্তব শক্তিতে পরিণত হয় না। তাকে জাগাতে হয়। তবেই আত্মবিস্মৃত মানুষ তার ভেতরকার সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান পাবে এবং সৃষ্টি হবে জীবনের অপার সম্ভাবনা ও আনন্দের জয়গান।

লেখক: ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad