বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত দুই দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগও পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশী বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই সামনে চলে আসছে যে, সংখ্যাগত এ সম্প্রসারণ কি গুণগত উৎকর্ষকে নিশ্চিত করতে পেরেছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মান কেবল শিক্ষার্থীসংখ্যা, নতুন ভবন, বাজেট কিংবা নতুন বিভাগ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, গবেষণার মাধ্যমে কতটুকু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করছে, স্নাতকেরা কর্মক্ষেত্রে কতটা দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানে প্রতিষ্ঠানটি কতটা অবদান রাখছে এবং সর্বোপরি, প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে কতটা আত্মসমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করতে পারছে তার ওপর। এ কারণেই বিশ্বের উন্নত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সেলফ এসেসমেন্ট কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।
বাংলাদেশে সেলফ এসেসমেন্ট-এর ধারণা নতুন নয়। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ২০১৬ সালে একটি সেলফ এসেসমেন্ট ম্যানুয়েল প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তথ্য-প্রমাণভিত্তিকভাবে নিজেদের একাডেমিক কার্যক্রম মূল্যায়নের একটি কাঠামো প্রস্তুত করে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক দশক পর প্রশ্ন উঠতেই পারে এ উদ্যোগ কি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি স্থায়ী গুণগত সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছে?
বাস্তবতা হলো, সেলফ এসেসমেন্ট-এর ধারণা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম বা প্রতিবেদন তৈরির অনুশীলনে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অথচ সেলফ এসেসমেন্ট-এর মূল দর্শন হলো গুণগত মানের ধারাবাহিক উন্নয়ন। সেলফ এসেসমেন্ট-এর মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করাই এর শেষ লক্ষ্য নয়, বরং সেই প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মানের টেকসই উন্নয়ন করাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য।
বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিতভাবে নিজেদের পাঠ্যক্রম, শিক্ষণ-পদ্ধতি, গবেষণা, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার, প্রশাসনিক সেবা, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল এবং অংশীজনের মতামত বিশ্লেষণ করে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই, নিয়োগকর্তা ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, যার সাফল্য নির্ভর করে সমাজের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ওপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেলফ এসেসমেন্ট-এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পাঠ্যক্রম হালনাগাদে বিলম্ব, গবেষণার সীমিত উৎপাদনশীলতা, শিল্প-একাডেমিয়ার দুর্বল সংযোগ, স্নাতকদের দক্ষতা নিয়ে নিয়োগদাতাদের উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চাপ এসব সমস্যা কেবল নতুন ভবন নির্মাণ বা বাজেট বাড়িয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সেলফ এসেসমেন্ট-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। এটি অনুমাননির্ভর নয়, বরং তথ্যনির্ভর। শিক্ষার্থীরা ক্লাস সম্পর্কে কী ভাবছে, গবেষণাগারের সক্ষমতা কতটা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কেমন, গ্রন্থাগারের ব্যবহার কতটা কার্যকর, স্নাতকদের কর্মসংস্থানের হার কী এসব প্রশ্নের উত্তর পরিমাপযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে জানা যায়। তখন উন্নয়ন পরিকল্পনাও হয় বাস্তবভিত্তিক ।
২০১৬ সালের সেলফ এসেসমেন্ট ম্যানুয়াল নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষার বাস্তবতা গত এক দশকে আমূল বদলে গেছে। এখন ফলাফল-ভিত্তিক শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল, আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা এবং বৈশ্বিক দক্ষতা উচ্চশিক্ষার অপরিহার্য অংশ। ফলে সময়ের দাবি হলো, আত্মমূল্যায়নের বিদ্যমান কাঠামোকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিৎ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল পরিমাপ, গবেষণার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব, ডিজিটাল শিক্ষার কার্যকারিতা, একাডেমিক সততা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের মতো বিষয়গুলো নতুন ম্যানুয়ালে আরও সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এখানেই ইউজিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউজিসি’কে কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নয়, উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবেও কাজ করতে হবে।
২০১৬ সালের সেলফ এসেসমেন্ট ম্যানুয়াল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে পুনর্বিবেচনা ও হালনাগাদ করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল’কে (আইকিউএসি) শুধুমাত্র প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সেল হিসেবে নয় বরং আরও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দিতে হবে। সেলফ এসেসমেন্ট-এর ফলাফল সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং তুলনামূলক মূল্যায়নের জন্য একটি জাতীয় ডিজিটাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স ড্যাশবোর্ড তৈরি করা যেতে পারে। এতে দেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত প্রবণতা সম্পর্কে নীতিনির্ধারকেরা বাস্তব চিত্র পাবেন। সেলফ এসেসমেন্ট-এর সুপারিশ বাস্তবায়নকে গবেষণা অনুদান, উন্নয়ন প্রকল্প, কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ অ্যাক্রেডিটেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করা যেতে পারে।
একটি বিভাগ যদি ধারাবাহিকভাবে সেলফ এসেসমেন্ট-এর মাধ্যমে নিজেদের উন্নত করে, তবে সেই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি ও প্রণোদনা থাকা উচিত। একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেলফ এসেসমেন্ট’কে কখনোই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আশঙ্কা করে যে, দুর্বলতা তুলে ধরলে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। বাস্তবে এর সত্য উল্টোটা। যে প্রতিষ্ঠান নিজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে পারে এবং তা মোকাবেলা করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে, সেই প্রতিষ্ঠানই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে। সেলফ এসেসমেন্ট দুর্বলতার নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার লক্ষণ।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চলমান শিল্পবিপ্লব এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়কে হতে হবে জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী মাননিশ্চয়ন ব্যবস্থা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সেলফ এসেসমেন্ট। আর সেজন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারক সকলেই সেলফ এসেসমেন্ট’কে ধরাবাহিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবেন। বছরে একবার প্রতিবেদন প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও কর্মসম্পাদনের মধ্যেই সেলফ এসেসমেন্ট-এর চর্চা থাকতে হবে।
উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন কোনো এককালীন প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধারাবাহিক এবং প্রমাণভিত্তিক যাত্রা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চায়, তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। আর সেই বিনিয়োগের সবচেয়ে কার্যকর, সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল এবং সবচেয়ে টেকসই মাধ্যম হলো প্রাতিষ্ঠানিক সেলফ এসেসমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, বরং তা ভেতর থেকে গড়ে তুলতে হয়। সেই পরিবর্তনের প্রথম শর্ত হলো নিজের দিকে সৎভাবে তাকানোর সাহস। সেলফ এসেসমেন্ট সেই সাহসেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আগামী দিনের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে, আমরা এই সংস্কৃতিকে কত দ্রুত এবং কত আন্তরিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি তার ওপর।
লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন


