সংবিধানের সীমা অতিক্রম: ‘এমপি রাজ’ ও স্থানীয় শাসনের দ্বন্দ্ব

সংবিধানের সীমা অতিক্রম: ‘এমপি রাজ’ ও স্থানীয় শাসনের দ্বন্দ্ব
জাতীয় সংসদ | ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

সম্প্রতি কুষ্টিয়া-৩ তথা সদর আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা নিজেকে আগামী ৫ বছরের জন্য এই আসনের ‘প্রধানমন্ত্রী’হিসেবে অভিহিত করেছেন। আরেকদিকে টাংগাইল-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম নিজ নির্বাচনী এলাকার বনবিভাগের এক রেঞ্জ কর্মকর্তাকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বদলি করতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিতে দেখা যায় স্থানীয় এলাকার সংসদ সদস্য বলে।

এটি একটি প্রচলিত বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়: সংসদ সদস্যরা (এমপি) আইন প্রণেতা থেকে স্থানীয় ‘হর্তকর্তা’তে পরিণত হচ্ছেন। কিন্তু সংবিধান কী বলে এবং বাস্তবতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে গভীর দ্বন্দ্ব রয়েছে।

সাংবিধানিক কাঠামো: এমপি আইন প্রণেতা, শাসক নন

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্যের ভূমিকা স্পষ্ট এবং সীমাবদ্ধ। তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য, যা প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। সংবিধানে প্রদত্ত  তার মূল দায়িত্ব হলো:

* আইন প্রণয়ন ও সংশোধন: সংসদে বিল উত্থাপন ও পাসের মাধ্যমে দেশের আইন তৈরি করা ।

* সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা: প্রশ্নোত্তর, আলোচনা ও সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করা বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

* বাজেট অনুমোদন: রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর তদারকি করা।

সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করেছে, এবং ৭০ অনুচ্ছেদ দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় সংসদ সদস্যদেরকে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিতে নিষেধ করেছে। এই কাঠামোতে স্থানীয় শাসন বা উন্নয়নমূলক কাজের কোনো উল্লেখ নেই। সংসদ সদস্যদের কর্মস্থল হলো সংসদ ভবন, আর স্থানীয় শাসনের দায়িত্ব নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা) ওপর ন্যস্ত।

বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি: ‘এমপি রাজ’-এর উত্থান

আরও পড়ুন

কিন্তু বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনগণের প্রত্যাশা ও প্রশাসনিক জটিলতায় এমপিরা স্থানীয় উন্নয়ন ও সেবা প্রদানে মুখ্য ভূমিকায় চলে এসেছেন। এই বাস্তবতার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:

১. ‘থোক বরাদ্দ’ও উন্নয়নের রাজনীতি: বর্তমানে প্রত্যেক এমপি বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দ (থোক) পেয়ে থাকেন, যা তিনি নিজ এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করতে পারেন। এই বিপুল অর্থের কর্তৃত্ব তাকে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। যদিও সম্প্রতি নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে যা সংসদ সদস্যদের চাহিদার আলোকে করা হবে বিধায় এখানেও এমপিদের আকাংখারই প্রতিফলন হবে বলে ধরে নেয়া যায়।

২. সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পে কর্তৃত্ব: খাদ্য সহায়তা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ প্রায় ৪০ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্ধারণে এমপিদের সম্মতি কার্যকর হয়ে উঠেছে।

৩. প্রশাসনের ওপর প্রভাব: স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ওপর এমপিদের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা স্থানীয় সরকার কাঠামোকে দুর্বল করে দেয় ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংবিধানের সীমা অতিক্রম করে এমপিদের এই ক্ষমতা একটি ‘এমপি রাজ’ সৃষ্টি করেছে, যা স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করছে। সম্প্রতি স্থানীয় এলাকায় ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে একজন সংসদ সদস্যের প্রচেষ্টা থেকে সৃষ্ট বিতর্ক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে একজন এমপি’র নিজেকে নির্বাচনী এলাকার প্রধানমন্ত্রী মনে করা কিংবা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রন করতে এমপি হিসেবে নির্দেশনা বাস্তবায়নের চাপ দেয়া এবং সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে ‘পরিদর্শন কক্ষ’তৈরির উদ্যোগ এই ‘এমপি রাজ’ প্রতিষ্ঠার প্রবণতারই প্রমাণ ।

দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মূল কারণ

এই সাংবিধানিক সীমা ও বাস্তব কর্তৃত্বের ফারাকই সংঘাতের মূল বীজ। যখন একজন এমপি নিজেকে স্থানীয় ‘রাজা’মনে করেন, তখন তিনি স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি (যেমন ইউপি চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়র) ও প্রশাসনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। ক্ষমতার এই দ্বন্দ্ব উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং জনগণকে প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত করে।

সিদ্ধান্ত ও করণীয়

আমির হামজা বা আহমেদ আজম এমপি’র বক্তব্য যেমন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, তেমনি এটি সংবিধান ও শাসন কাঠামো নিয়ে পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগও বটে।

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:

১. ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ: আইনগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগে এমপিদের স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা আইনসভার সদস্য হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা সুস্পষ্ট করতে হবে। সংবিধানের ৫৬ ও ৫৯ অনুচ্ছেদের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

২. স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা: নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের প্রকৃত ক্ষমতা প্রদান ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. জবাবদিহি নিশ্চিত করা: এমপিদের উন্নয়ন তহবিল, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ‘হর্তাকর্তা’না হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিণতি ও সুশাসন নির্ভর করে সংবিধানের সীমা মেনে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সঠিক ভূমিকা পালনের ওপর। ‘এমপি রাজ’ -এর অবসান ঘটিয়ে ‘জনগণের রাজ’ -ই হতে হবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad