আলোচনায় কিশোর গ্যাং। ‘কিশোর’ শব্দটা মধ্যবর্তী, কোমল। সারল্যের শৈশব আর পরিণত শক্তির যৌবনের মাঝামাঝি থাকে কৈশোরকাল। সেই শব্দের সঙ্গে ‘গ্যাং’ যুক্ত হলে? চিত্রটা তৈরি হয় আতংকের। কিশোরের কোমল মুখটি তখন আর দেখা যায় না। দেখা যায় ‘অপরাধপ্রবণ সংঘবদ্ধ দল’। তারা শহরের কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও একটা মোড়ে বা গলিতে জড়ো হয়ে আছে। কখনো কখনো তাদের হাতে রামদা, ছুরি বা দেশি অস্ত্র। কেউ ভিডিও করে। কেউ চিৎকার করে। বড়রা দেখলেও তাৎক্ষণিক কিছু বলার সাহস করে না।
মন্তব্য আসে, এই ছেলেগুলো বখে গেছে। কঠোর হাতে দমন দরকার। প্রতিক্রিয়াটা ভুল নয়। তবে অসম্পূর্ণ। যে কিশোরটি রামদা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়। সেই প্রশ্নটা হলো, সে এই জায়গায় এলো কীভাবে?
কৈশোর একটা মানুষের জীবনের এমন একটা সময়, যখন সে নিজেকে চেনার চেষ্টা করে। পরিচয় খোঁজে। এমন একটা জায়গা সে খোঁজে যেখানে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রতিবেশ এই খোঁজে সাড়া দিতে না পারলে কিশোরদের কেউ কেউ বিকল্প জায়গা খুঁজে নেয়। সেই বিকল্প জায়গাটাই কখনো কখনো একটা গ্যাং হয়ে ওঠে। তারপর অস্ত্র, মাদক, ছিনতাই, মারামারি, চাঁদাবাজি, নারীঘটিত বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
অনেক মা-বাবা এখন দুজনই কর্মজীবী। সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় কমে আসে। এই ব্যস্ততাকে একা দোষ দেওয়া অন্যায় হবে। এই সময়কালের পরিবার থাকে বড় অর্থনৈতিক চাপের ভেতরে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও প্রশ্নের বাইরে নয়। পরীক্ষার ফল আর ভর্তি প্রতিযোগিতা ছাড়া একজন কিশোরের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর কী দিচ্ছে? খেলার মাঠ কতটা আছে? বিতর্ক, নাটক, সংগীতের চর্চা কতটা আছে? বিদ্যালয় ফলাফলের কারখানা হয়ে গেলে, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া কিশোরের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার জায়গা থাকে না। সে তখন সেই জায়গাটা বাইরে খুঁজে নিতে মরীয়া থাকে।
আর বাইরে গিয়ে সে কী পায়? পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠ নিয়ে বছরের পর বছর মামলা চলছে। চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়ামের মতো মাঠও বেশির ভাগ সময় মেলার দখলে থাকে। মাঠ কমছে। দেশের প্রায় সবখানে একই চিত্র। দখল বাড়ছে। পাঠাগার, জিমনেসিয়াম, সংগীত বা নাটকের চর্চাকেন্দ্র বড়জোর কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ।
এক প্রজন্ম আগেও মহল্লায় মহল্লায় ক্লাব ছিল। সেসব ক্লাবে বিকেলে ক্যারমসহ নানা ক্রীড়ার ব্যবস্থা থাকতো। সন্ধ্যায় বড়দের সঙ্গে আড্ডা হতো। বড়রা কিশোর-তরুণদের চোখে চোখে রাখত। সেসব ক্লাবের অনেকগুলোই এখন বন্ধ। নয়তো দখল হয়ে গেছে। নয়তো রাজনৈতিক কার্যালয়ে রূপ নিয়েছে। যে জায়গা একসময় সামাজিক তদারকির কেন্দ্র ছিল, সেটাই এখন বিভাজনের কেন্দ্র।
একটা সমাজ তার তরুণদের সময় কাটানোর গঠনমূলক জায়গা না রাখলে বিকল্প সামনে চলে আসে। সেই জায়গাটা খালি থাকে না। অন্য কিছু দিয়ে ভরে ওঠে। রাজনৈতিক দলের মিটিং-মিছিলে লোক দরকার হয়। প্রতিপক্ষ ঠেকাতে লোক দরকার হয়। এসব চাহিদার জোগান দেয় ঠিক সেই তরুণেরা। তাদের হাতে তো আর কোনো বিকল্প ব্যস্ততা নেই।
অনেক কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে এক বা একাধিক ‘বড় ভাই’ থাকে। তাদের রাজনৈতিক কানেকশন বা স্থানীয় প্রভাব থাকে। তারা কিশোরদের ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা প্রতিপক্ষ দমনের কাজে। আইনের চোখে তখন কিশোর অপরাধী হয়। কিন্তু প্রকৃত সুবিধাভোগী থাকেন আড়ালে। শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে এই চক্র ভাঙা যায় না। যতক্ষণ না সেই পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়।
আবার কিশোর গ্যাংকে শুধু অস্বচ্ছল পরিবারের সমস্যা ভাবাটাও ভুল। সচ্ছল পরিবারের অনেক কিশোরও এসব দলে জড়ায়। গ্যাং যা দেয় তা কেবল টাকা নয়। ভয় তৈরির ক্ষমতা। পরিচিতি। একটা দলের অংশ হওয়ার অনুভূতি। তার কাছে এসবও একরকম মর্যাদা। নিম্নবিত্ত কিশোরের কাছে গ্যাং দ্রুত পরিচয় আর আয়ের পথ। সচ্ছল কিশোরের কাছে সেটাই রোমাঞ্চ। কারণ আলাদা হলেও ফল একই জায়গায় গিয়ে মেশে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসব আকর্ষণকে আরও ধারালো করে তোলে। অস্ত্র হাতে ছবি, হুমকি। প্রায় সবই এখন কনটেন্ট। বাস্তব জীবনে অবহেলিত বোধ করা কিশোর অনলাইনে হঠাৎ হাজার লাইক পায়। তখন কিশোর-তরুণের মনে এসব আকর্ষণ আরও তীব্র হয়ে আসে।
মাদক এই শূন্যতার আরেকটা সহজ গন্তব্য। বিশেষ করে সর্বনাশা ইয়াবার বাজার তরুণদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। কেননা তার হাতে সময় আছে কিন্তু কাজ নেই। লক্ষ্য নেই। তার কাছে একটা মাদকের বড়ি মানে বিশাল বড় এক ফ্যান্টাসি। বিকল্প কিছু হাতের কাছে না থাকলে ভয়ংকর ফ্যান্টাসির পথই তার কাছে সহজতম মনে হয়।
আবার রয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা। এই প্রশ্নটা আরও গভীর। আরও অস্বস্তিকর। কারণ কেবল কাঠামোগত অবহেলা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে এমন একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে নারীকে সম্মান করার শিক্ষা শৈশব থেকে যথেষ্ট জোরালোভাবে দেওয়া হয় না। যে সমাজব্যবস্থা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার শিক্ষা রাখে না, সেই সমাজই পরে অবাক হয়ে প্রশ্ন তোলে ‘এমন কেন হচ্ছে?’
এখানেই সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা দেখা যায়। একদিকে নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ। অন্যদিকে প্রকাশ্য মঞ্চে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের অবাধ প্রচার। কখনো কখনো তা আবার ধর্মীয় বা নৈতিক শিক্ষার নামেই বয়ান হচ্ছে। কিশোর-তরুণ তখন দেখে, নারীকে অপমান করা বক্তব্য লাখো ভিউ পাচ্ছে। অথচ শুনছে সম্মান রাখার উপদেশ। ফলে কোন বার্তাটা তার কাছে বেশি জোরালো সেই হিসাব মেলানো কঠিন কিছু নয়।
সমাধানের প্রশ্নে সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো দমন। অভিযান। গ্রেপ্তার। কঠোর আইন প্রয়োগ। অবশ্যই এসব দরকার। অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে শুধু দমন দিয়ে সমস্যার উৎস বোঝা যায় না। যে কাঠামো একজন কিশোরকে গ্যাংয়ের দিকে ঠেলে দেয়, সেই কাঠামো অক্ষত রেখে সমাধান মিলবে?
একটা প্রজন্মকে শুধু জেলে পাঠিয়ে সমাধান হয় না। সংশোধনাগার থেকে ফেরার পর সেই কিশোরের জন্য সমাজে নতুন কোনো জায়গা তৈরি হয় কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরও খোঁজা জরুরি। শাস্তি শেষ হলেই গল্প শেষ হয়ে যায়। অথচ তারপরই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। একই বন্ধুবৃত্ত, একই পাড়া, একই অভাব, একই বাস্তবতার প্রভাব, তাকে আবার সেই পুরোনো বৃত্তের দিকেই টেনে নেয়।
একজন নীতিনির্ধারক সম্প্রতি নিজের নির্বাচনী এলাকায় বলেছেন, রাতে কিশোররা অকারণে রাস্তায় ঘোরাফেরা করলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। কথাটা আংশিক ঠিক। প্রশ্ন হলো, তারা রাস্তায় কেন থাকে। বাড়িতে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে রাস্তা তো এত আকর্ষণীয় হতো না। একটা শেওড়া গাছ লাগিয়ে তা থেকে আম আশা করা যায় না। যে সমাজ মাঠ ভেঙে মার্কেট বানায়, পাঠাগার না রেখে টার্ফ ব্যবসা গড়ে, শিল্পচর্চার জায়গা না দিয়ে রাজনৈতিক পদ-পদবির লোভ দেখায়, সেই সমাজ তরুণদের কাছ থেকে শৃঙ্খলা আশা করতে পারে না। বীজ বোনার সময় অবহেলা হলে ফসলের সময় মূল্য চুকাতে হয়। প্রতি প্রজন্মে নতুন করে মূল্য দেওয়া লাগে। কারণ কাঠামোটা বদলায় না। শুধু মুখগুলো বদলায়।
তাহলে সমাধান কোথায়? প্রথমে স্বীকার করতে হবে, সমস্যাটা তরুণদের চরিত্রের নয়। সমস্যাটা সেই কাঠামোর, যেখানে তাদের জন্য বিকল্প কিছু রাখেনি। মাঠ রক্ষা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা হওয়া উচিত। পাঠাগারের চর্চা হওয়া উচিত প্রতিটি উপজেলায়। আর সবচেয়ে জরুরি, প্রকাশ্যে নারীবিদ্বেষ ছড়ানোকে নৈতিকতার মোড়ক দেওয়া বন্ধ করা। এসবের সঙ্গে সবসময় বিশাল বাজেটের সম্পর্ক থাকে না। তবে অগ্রাধিকারের প্রশ্নে সততা, সদিচ্ছা থাকতে হবে। রাষ্ট্র মেলা বসানোর অনুমতি দ্রুত দেয়। আবার মাঠ রক্ষার আদেশ কার্যকর করতে বছরের পর বছর সময় নেয়। তখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা আসে, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার আসলে কোথায়?
লেখক: কবি, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক


