প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যা: বয়ান নয়, প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক পুনঃতদন্ত

প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যা: বয়ান নয়, প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক পুনঃতদন্ত
ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, আলোচিত এবং অমীমাংসিত অধ্যায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিহত হন। এর পর বিদ্রোহ, গ্রেপ্তার, পাল্টা অভিযান, সামরিক বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে ঘটনাটির একটি প্রচলিত বিবরণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে চার দশকের বেশি সময় পরও কিছু মৌলিক প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যায়নি।

এই হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে এর উদ্দেশ্য নতুন কোনো রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা নয়, বরং পুরোনো সব বয়ানকে প্রমাণের সামনে দাঁড় করানো। কারণ রাষ্ট্রের ইতিহাস অনুমান, আনুগত্য কিংবা প্রচারণার ওপর নির্ভর করতে পারে না। ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হতে হয় যাচাইযোগ্য নথি, সাক্ষ্য, ফরেনসিক আলামত ও নির্ভুল সময়রেখার ওপর।

এই অনুসন্ধানে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিদ্যমান নথি কী বলছে। দ্বিতীয়ত, নথি কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়নি; এবং তৃতীয়ত, একটি কার্যকর পুনঃতদন্তে এখন কোন কোন প্রমাণ সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

নথি কী বলছে

হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ৬ জুন একটি কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠন করা হয়। কমিশনের প্রধান কাজ ছিল এই হত্যাকাণ্ড কোনো ষড়যন্ত্রের ফল কি না, ষড়যন্ত্রকারীরা কারা, তাদের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা কী ছিল এবং কারা এতে সহায়তা করেছিল তা অনুসন্ধান করা। তবে ১৩ জুন আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানের এই মূল কার্যপরিধিই বাদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কমিশন গঠনের মাত্র সাত দিনের মাথায় হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তা সত্ত্বেও কমিশনের প্রতিবেদনে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে একদল সামরিক কর্মকর্তা ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। সার্কিট হাউসের অভিযানে ১৪ থেকে ১৬ জন কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু কার্যপরিধি থেকে ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানের ক্ষমতাই যেখানে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কতটা বিস্তৃত তদন্তের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, তা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

কমিশন ৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে। প্রতিবেদনে গোয়েন্দা ব্যর্থতা, নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে ধারণা ছিল এবং রাষ্ট্রপতিকেও সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু ২৯ মে রাত থেকে ৩০ মে ভোর পর্যন্ত কী ঘটতে যাচ্ছিল, সে বিষয়ে সংস্থাগুলো কোনো আগাম তথ্য দিতে পারেনি। তাছাড়া পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত সদস্য ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও সার্কিট হাউসে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনের দুই পুলিশ সদস্যকে রাত ১০টার দিকে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সাক্ষ্যে উঠে আসে। পাশাপাশি পুলিশ, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট এবং রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের মধ্যে কার্যকর সমন্বিত কমান্ড ছিল না।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো কমিশন আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা তার ব্যক্তিগত স্টাফের ভেতর থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি দুর্বল করে থাকতে পারেন। কমিশন কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র চিহ্নিত করে। যেমন—কক্ষ বণ্টনের টাইপ করা তালিকা সংগ্রহ করা, নিরাপত্তারক্ষী সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, ওয়্যারলেস থাকা সত্ত্বেও সময়মতো সহায়তা না চাওয়া এবং একটি কক্ষের গুলির চিহ্ন পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে এমন সন্দেহ।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির শরীরে প্রায় ২০টি পৃথক বুলেটের ক্ষতের কথা বলা হলেও ব্যবহৃত অস্ত্রের সংখ্যা, ক্যালিবার, গুলির দিক, দূরত্ব এবং নির্দিষ্ট অস্ত্রের সঙ্গে ক্ষতের সম্পর্কের বিষয়ে কোনো ব্যালিস্টিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মেজর জেনারেল মঞ্জুরের মৃত্যু। নথি অনুযায়ী, তিনি জীবিত অবস্থায় পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। ঢাকার নির্দেশ পাওয়ার পর লিখিত রসিদ দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। মঞ্জুর বেসামরিক হেফাজতে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার হাত-পা বেঁধে ও চোখ ঢেকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেনানিবাসে ঢোকার পর তাকে বহনকারী গাড়ির পথ পরিবর্তন করা হয় এবং পরে তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী যদি হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হন, তবে সেই মৃত্যু মূল সত্য অনুসন্ধানের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

নথি কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়নি

আরও পড়ুন

প্রথমত, ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানের বিষয়টিকে কমিশনের কার্যপরিধি থেকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছিল, কে এই সিদ্ধান্ত প্রস্তাব ও অনুমোদন করেছিলেন এবং সরকারি ফাইলে কী যুক্তি দেওয়া হয়েছিল তা অজানা।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতির রাজশাহী সফর বাতিল করে চট্টগ্রাম সফরের সিদ্ধান্ত কখন এবং কীভাবে নেওয়া হয় এবং সফর স্থগিতের কোনো গোয়েন্দা পরামর্শ থাকা সত্ত্বেও তা কেন মানা হয়নি, সেই উত্তর মিলেনি।

তৃতীয়ত, মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে জানার পরও নিরাপত্তা কেন জোরদার করা হয়নি এবং এসব সতর্কতা লিখিত ছিল না মৌখিক, আর কোন কর্মকর্তা কখন তা পেয়েছিলেন তা অস্পষ্ট।

চতুর্থত, রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনের নিরাপত্তারক্ষীদের সরানোর নির্দেশ কে এবং কেন দিয়েছিলেন তা জানা যায়নি।

পঞ্চমত, রাষ্ট্রপতির অবস্থানসহ সার্কিট হাউসের কক্ষ বণ্টনের টাইপ করা তালিকা কেন সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং তা কার কাছে পৌঁছেছিল সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ষষ্ঠত, কার্যকর ওয়্যারলেস ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফ কেন সময়মতো আর্মি হেডকোয়ার্টার বা অন্য বাহিনীর সাহায্য চায়নি, তা একটি বড় প্রশ্ন।

সপ্তমত, প্রায় ২০টি বুলেটের ক্ষত কোন কোন অস্ত্র থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে পাওয়া খোসা, বুলেট ও অস্ত্রের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না তা স্পষ্ট নয়।

অষ্টমতঃ তথাকথিত আর্মি রেভোলিউশনারি কাউন্সিলের সদস্য কারা ছিলেন এবং সরাসরি অংশ নেওয়া ১৪ থেকে ১৬ জনের বাইরে মূল পরিকল্পনাকারী বা রাজনৈতিক যোগাযোগকারী কেউ ছিলেন কি না তা অনুদ্ঘাটিত।

সবশেষ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নবম প্রশ্নটি হলো, পুলিশ থেকে সেনা হেফাজতে মঞ্জুরকে হস্তান্তরের নির্দেশ ঢাকা থেকে কে দিয়েছিলেন, হস্তান্তরের লিখিত রসিদ কোথায়, গাড়ির পথ কেন পরিবর্তন করা হলো এবং একজন হাত-পা বাঁধা বন্দি কিভাবে সশস্ত্র ব্যক্তিদের সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়লেন। এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, আবার প্রশ্নগুলো এড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসও লেখা যায় না।

পুনঃতদন্তে কোন প্রমাণ প্রয়োজন

পুনঃতদন্তের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কমিশনের সম্পূর্ণ আর্কাইভ উদ্ধার করা। শুধু প্রকাশিত প্রতিবেদন নয়- ৬৭ জন সাক্ষীর মূল জবানবন্দি, লিখিত বক্তব্য, কার্যবিবরণী, সদস্যদের নোট, ঘটনাস্থলের ছবি, স্কেচ, অস্ত্রের তালিকা ও সংযুক্ত নথি উদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে ১৯৮১ সালের ৬ ও ১৩ জুনের প্রজ্ঞাপনের মূল সরকারি ফাইল সংগ্রহ করে ষড়যন্ত্রের অংশ বাদ দেওয়ার নোটশিট, মতামত ও অনুমোদনের ধাপ পরীক্ষা করা দরকার।

রাষ্ট্রপতির সফরসূচি, সিদ্ধান্ত বদল ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পাশাপাশি ঘটনার রাতের সেনা যানবাহনের লগবুক, নাইট ট্রেনিংয়ের আদেশ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ ইস্যু রেজিস্টার মিলিয়ে একটি নির্ভুল সময়রেখা তৈরি করতে হবে। মঞ্জুরকে হস্তান্তরের রসিদ, ওয়্যারলেস বার্তা ও এসকর্ট সদস্যদের বক্তব্য সংগ্রহ করা জরুরি। পাশাপাশি জীবিত সাক্ষীদের অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরোনো বক্তব্যের সঙ্গে কন্ট্রাডিকশন ম্যাট্রিক্স তৈরি করা যেতে পারে।

ময়নাতদন্তের মূল প্রতিবেদন, এক্স-রে, আলামত ও ছবি আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনঃবিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। সার্কিট হাউসের গুলির চিহ্ন ও নকশা ব্যবহার করে থ্রিডি ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন করা হলে আক্রমণকারীদের অবস্থান ও নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতিরোধের সুযোগ স্পষ্ট হবে। দেশীয় প্রমাণের পাশাপাশি তৎকালীন বিদেশি দূতাবাসের বার্তা, কূটনৈতিক প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক ডিক্লাসিফায়েড দলিল সংগ্রহ করে অন্য তথ্যের সঙ্গে যাচাই করা দরকার।

সত্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সম্পত্তি নয়

পুনঃতদন্তের অর্থ আগে প্রতিষ্ঠিত সব সিদ্ধান্ত ভুল—এমন নয়। আবার পুরোনো তদন্ত হয়েছে বলেই সব উত্তর পাওয়া গেছে, তা-ও বলা যায় না। পুনঃতদন্তের মূল কাজ হবে দোষী নির্ধারণের আগে প্রমাণ উদ্ধার, বক্তব্য যাচাই, ঘটনাক্রম পুনর্গঠন এবং দায়-দায়িত্ব স্পষ্ট করা।

নথি যেখানে কথা বলেছে, সেখানে নথির ভাষায় কথা বলতে হবে। নথি যেখানে নীরব, সেখানে প্রশ্ন তুলতে হবে। আর যে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, তার জন্য প্রমাণ অনুসন্ধান করতে হবে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তি হত্যার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক নির্ণায়ক অধ্যায়। সেই ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ নথি, রাজনৈতিক সুবিধা বা প্রচারিত বয়ানের মধ্যে আটকে রাখা উচিত নয়। সঠিক ইতিহাস জানার অধিকার রাষ্ট্রের, জনগণের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। এই পুনঃতদন্ত কোনো প্রতিশোধ বা পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের জন্য নয়, বরং সত্যের অসমাপ্ত অনুসন্ধান সম্পন্ন করার জন্যই প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কারও দাবি মনে রাখে না, ইতিহাস টিকে থাকে সেই প্রমাণে, যা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও সত্য থাকে।

লেখক: প্রসিকিউটর এবং বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর