নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবারের আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ার কারণে হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এতে বরফ, পাথর ও পলিমাটির বিশাল স্তূপ নেমে এসে নদীতে ভয়াবহ স্রোতের সৃষ্টি করে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৩০০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
প্ল্যানেট ল্যাবসের তোলা দুর্যোগের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। ছবিতে দেখা গেছে, আগে সবুজে ঢাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ এখন বাদামি ধ্বংসাবশেষ ও পলিতে ঢেকে গেছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণে হিমবাহের সামনের অংশের (স্নাউট) বড় একটি অংশ ধসে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাথর ও পলিও নেমে আসতে পারে বলে জানান তিনি।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার বলেন, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় বিপুল পরিমাণ তুষার গলে থাকতে পারে। এতে উষ্ণ আবহাওয়ার ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে সীমান্ত এলাকায় অনুভূত একটি ভূমিকম্প হিমবাহ বা ভূমিধসের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) সর্বশেষ বিশ্লেষণে ওই সময়ে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকম্পের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল বলেন, নেপালের অংশে একটি ‘বরফ-পাথরের তুষারধস’ থেকেই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনায় ধারণা পাওয়া গেছে। তবে ঠিক কী কারণে এই ধসের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিবৃষ্টি কিংবা দ্রুত বরফ গলে যাওয়া মাটি ও বরফের স্তরকে অস্থিতিশীল করে ধসের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়লেও এই নির্দিষ্ট ঘটনায় এর ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
দুর্যোগে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত ভুটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা আইসিমোড জানিয়েছে, গালছী এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
নুওয়াকোটসহ উত্তর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রবল স্রোত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কাদা ও পাথরের স্রোত বাড়িঘর, সড়ক ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে ত্রিশূলী নদীর গিরিখাত দিয়ে পানির সঙ্গে কাদামাটি ও পাথরের বিশাল ঢল নেমে এসে রাসুভাগাধী সীমান্ত চেকপোস্টের বহুতল ভবন ঘিরে ফেলতে দেখা যায়।
ভুটে কোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীতেও তীব্র বন্যার খবর পাওয়া গেছে। তিব্বতের দিকের সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামেও প্রাণহানির খবর এসেছে।
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের দশকের তুলনায় পরবর্তী দশকে নেপালের হিমবাহ গলার হার ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার মতো দুর্যোগের ঘনত্ব ও তীব্রতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে আইসিমোড। সংস্থাটির মতে, পানি, ভূমি ও বায়ুমণ্ডলে দ্রুত পরিবর্তন ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
দুর্যোগের প্রকৃত কারণ জানতে বিজ্ঞানীরা এখন ঘটনাপ্রবাহ মেলানোর চেষ্টা করছেন। তারা স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে ধসের সুনির্দিষ্ট স্থান, কোনো হিমবাহ-হ্রদ হঠাৎ খালি হয়েছিল কি না, নদীর প্রবাহ কোথাও আটকে গিয়েছিল কি না এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের তথ্য পর্যালোচনা করছেন।
পর্বতারোহী ও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় এই এলাকা রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার উত্তরে। দুর্যোগকবলিত রাসুয়া জেলায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


