ইয়েমেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাসিম বুহাইবেহ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ কমপ্লেক্সে অবস্থিত সরকারি সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হুথিরা এ হামলা চালায়। হামলার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা নিরাপদে আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-ইরিয়ানি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলার সময় প্রাসাদের কাছাকাছি এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইয়েমেনের মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের মধ্যে চলমান সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে এডেনের আল-মাশিক প্রাসাদে এটিই প্রথম হামলা। প্রাসাদটি সৌদি-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছেন, তাদের যোদ্ধারা এডেনে সৌদি সামরিক অভিযানের সদর দপ্তরে বোমা হামলা চালিয়েছেন। যেখানেই সৌদি সামরিক শক্তিবৃদ্ধির তৎপরতা থাকবে, সেখানেই হামলা চালানোর ঘোষিত নীতির অংশ হিসেবে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, ওই সদর দপ্তর সৌদি কর্মকর্তারা পরিচালনা করতেন এবং সেখানে অস্ত্রের গুদাম ছিল।
গত মাসে হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এর পর থেকে ইয়েমেনের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে বলে সতর্ক করেছে বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংস্থা।
গত সপ্তাহে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনর্দখলে অভিযান শুরু করে সরকারি বাহিনী। অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছে কিছু এলাকা পুনরুদ্ধারের দাবি করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য করলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক হস্তক্ষেপের পর রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িত দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা দীর্ঘ অচলাবস্থায় গড়ায়।
২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সেই সংঘাত থামে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল।
এর আগে এডেন দখলের লড়াইয়ের সময় হুথি যোদ্ধা ও তাদের মিত্র বাহিনী অল্প সময়ের জন্য আল-মাশিক প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। পরে তারা সেখান থেকে সরে যায়।
সৌদিতে অব্যাহত হুথি হামলা
এদিকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সৌদি আরব সমর্থন দেওয়ায় দেশটির বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে হুথিরা।
এসব হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে চাপের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশটির উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও হুমকির মুখে পড়ছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের অবকাঠামোর ওপর একের পর এক হামলা চালিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। এসব ঘটনায় দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার পরিচালনা পরিষদ সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর, উড়োজাহাজ ও বিমান চলাচলসংক্রান্ত অবকাঠামোয় সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুরকি আল-মালিকি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চলতি মাসে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০টি হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এসব হামলায় ১৭ জন নিহত এবং ৩৩৩ জন আহত হয়েছেন।
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কেন্দ্র।
সৌদি জোটের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আবহা বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় আরও তিনজন নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন।
তুরকি আল-মালিকি অভিযোগ করেছেন, আঞ্চলিক কিছু শক্তির সহায়তায় হুথিরা উন্নত সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহ করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুতগতির নৌযান।
ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করেছে সৌদি জোট। অবশ্য জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে হুথিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে তেহরান।
আল-মালিকি আরও জানিয়েছেন, ইয়েমেনের পার্বত্য এলাকায় হুথিদের ১২৭টি অস্ত্রের গুদাম ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে সব ধরনের সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করতে হুথিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এর কিছুক্ষণ পর হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক ঘোষণায় জানান, সৌদি আরবের আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো নিরাপদ নয়। তিনি বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি মক্কা ও মদিনা ব্যতীত সৌদির অন্য আকাশসীমা ব্যবহারে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।


