নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। একই সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, জড়িত সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
গত বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বরও তিনি দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
লুৎফুজ্জামান নেত্রকোণার বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রুপসী বাংলার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। স্থানীয় অপরাধ, মাদক কারবার, চোরাচালান, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে তিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার ওপর আগের হামলা ও সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানায় এইচআরএসএস।
সংগঠনটির কর্মকর্তাদের মতে, একজন সাংবাদিকের ওপর ধারাবাহিক হামলা এবং পরিণতিতে হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জননিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ওপর গুরুতর আঘাত। বিশেষ করে, পূর্ববর্তী হামলার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ বা নিরাপত্তার আবেদন করা হয়ে থাকলে, সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। সম্ভাব্য হুমকির তথ্য কর্তৃপক্ষের জানা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনারদাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সাংবিধানিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন
এইচআরএসএস বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী, আইন ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। একইভাবে অনুচ্ছেদ ৩৯(২) নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। সাংবাদিকের পেশাগত কাজের কারণে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকলে, তা এসব সাংবিধানিক অধিকারের বাস্তব চর্চার জন্য গুরুতর হুমকি।
সংগঠনটি আরও জানায়, জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (ইউডিএইচআর) অনুচ্ছেদ ৩ প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার স্বীকার করে। অনুচ্ছেদ ৮ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে কার্যকর প্রতিকারের অধিকার নিশ্চিত করে এবং অনুচ্ছেদ ১৯ মতামত পোষণ, তথ্য অনুসন্ধান, গ্রহণ ও প্রচারের স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) রাষ্ট্রপক্ষ। এ চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ জীবনের সহজাত অধিকার সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে এবং অনুচ্ছেদ ১৯ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য নং ৩৪-এ সাংবাদিকদের ওপর হুমকি, ভয়ভীতি, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের কার্যকর ও সময়োপযোগী তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এইচআরএসএস জোর দিয়ে বলছে, সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা শুধু অপরাধের বিচার নয়; বরং ভবিষ্যতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের পরিবেশ রক্ষার জন্যও অপরিহার্য।
বিবৃতিতে উল্লেখিত এইচআরএসএসের দাবিগুলো হলো- সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করা এবং হত্যার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য নির্দেশদাতা বা পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা, নিহত সাংবাদিকের পরিবারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, মানসিক সহায়তা এবং প্রযোজ্য আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
এইচআরএসএস মনে করে, স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার, দুর্নীতি ও অপরাধ উন্মোচন এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের পরিবেশকে সংকুচিত করে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজারে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী এক দোকানদার জানান, ‘ওই সাংবাদিক চা খেয়ে চলে যাওয়ার সময় মোবাইল ফেলে যান। সেটি নিতে আবার ফিরে আসেন। তিনি ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক এসে আমার কাছে সিগারেট চায়। এরপর তাকে গুলি করে। আমি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। ভয়ে বাসায় চলে যাই। দুই যুবকের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হবে। তাদের একজনের পরনে লুঙ্গি, অন্যজনের পরনে প্যান্ট ছিল। গুলি করার পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। কাছ থেকেই গুলি করা হয়েছে।’


