সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা: ২২ ঘণ্টা পরও হয়নি মামলা-গ্রেপ্তার

সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা: ২২ ঘণ্টা পরও হয়নি মামলা-গ্রেপ্তার
নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ২২ ঘণ্টা পার হলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি। এমনকি এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের (৪৪) স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা।

বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজারে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। তিনি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে এবং দুর্গাপুর পৌরসভার তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।

লুৎফুজ্জামান নেত্রকোণার বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রুপসী বাংলার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, লুৎফুজ্জামান বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফওয়ানকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী আনন্দিতাকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ এর কিছুক্ষণ পরই গ্রামের একটি দোকানের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

দোকানদার রবিন রাংসা বলেন, ‘সাংবাদিক চা খেয়ে চলে যাওয়ার সময় মোবাইল ফেলে যান। সেটি নিতে আবার ফিরে আসেন। তিনি ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক এসে আমার কাছে সিগারেট চায়। এরপর তাকে গুলি করে। আমি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। ভয়ে বাসায় চলে যাই। দুই যুবকের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হবে। তাদের একজনের পরনে লুঙ্গি, অন্যজনের পরনে প্যান্ট ছিল। গুলি করার পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। কাছ থেকেই গুলি করা হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার রাতেই পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

আরও পড়ুন

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

নেত্রকোণার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।’

এদিকে স্বামীকে হারিয়ে আনন্দিতা সাংমা ভেঙে পড়েছেন। ছেলেকে কোলে নিয়ে স্বামীর মরদেহের পাশে বসে বিলোপ করছিলেন তিনি। বলেন, ‘এভাবে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভাবছিলাম কেউ হয়ত ফটকা (পটকা) ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করে তাকে (লুৎফুজ্জামান) মেরে ফেলেছে।’

স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে আনন্দিতা সাংমা বলেন, ‘আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। তবে যারা আমার স্বামীকে মেরেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের কঠিন শাস্তি হোক, এটাই আমি চাই।’

লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের শ্বশুর বাড়ির লোকজন জানান, ঘটনার কিছু আগে তারা ঘরের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে দেখেন লুৎফুজ্জামানের মরদেহ মাটিতে পড়ে আছে। তার মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত বের হচ্ছে। পরে তাকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগেও একবার দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছিলেন লুৎফুজ্জামান। গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। ওই সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad