দেশের প্রধান দুই পর্যটন এলাকা কক্সবাজার ও সিলেটে কোনো নিয়মকানুন না মেনে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে একের পর এক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই এসব ব্যবসা চলায় পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, আবাসিক ভবনের কয়েকটা ঘর ভাড়া নিয়েই নাম দেওয়া হচ্ছে ‘রিসোর্ট’। আবার মৌলভীবাজারে পাহাড়, টিলা ও বন কেটে বানানো হচ্ছে পর্যটকদের থাকার জায়গা। নিয়ম ভাঙার বহু অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো নজরদারি দেখা যাচ্ছে না।
এই অবহেলার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা স্পষ্ট হয়েছে শনিবার। এদিন কক্সবাজারের উখিয়ায় পাটুয়ারটেক মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ‘টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে’ আগুন লেগে ১০ জনের মৃত্যু হয়। ওই রিসোর্টের কোনো ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না, এমনকি ফায়ার ফাইটিংয়ের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফ্রিন জুনাইদ জানান, রিসোর্টটিকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে গত জুন মাসেও সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।’
সাধারণত বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন প্রশাসনের অভিযান দেখা যায়, কিন্তু কিছুদিন পর সব আবার আগের মতো হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতা নিয়ে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় রিসোর্ট মালিক সমিতির হিসাব মতে, কক্সবাজারে ৫০০টিরও বেশি হোটেল ও রেস্তোরাঁ আছে। তবে মালিক সমিতির সদস্য মাত্র ১০০টির মতো। সংগঠনের নেতারাও স্বীকার করেন, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই সঠিক অনুমোদন বা বৈধ কাগজপত্র নেই।
একই অবস্থা সিলেটে। সেখানে ৫৫০টিরও বেশি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন বা ব্যবসায়ী সমিতি কেউই এর কতগুলোর আসল অনুমোদন আছে তা বলতে পারছে না।
মৌলভীবাজারে স্থানীয়দের মতে প্রায় ২০০টি রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গলেই ১০৩টি, আর রাধানগরে ৪০ থেকে ৪৫টি। বাকিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আশপাশের এলাকায়।
কক্সবাজার: বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি
কক্সবাজারের সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকত এলাকাসহ শহরের নানা জায়গায় ৫০০টিরও বেশি হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রিসোর্ট রয়েছে। পাশাপাশি আছে ১০০টিরও বেশি বড় রেস্তোরাঁ।
কিন্তু সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো সঠিক তালিকা নেই। একদিকে, গ্যাসের সিলিন্ডারের যথেচ্ছ ব্যবহার, অন্যদিকে এলোমেলো ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার—সব মিলিয়ে অগ্নিকাণ্ডের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়ে আছে।
অনুমোদনহীন রিসোর্টের বিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার টাইমসকে বলেন, ‘অবৈধ ও অনুমোদনহীন রিসোর্টের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। এটি একটি চলমান কাজ এবং আগেও অভিযান হয়েছে। নোটিশ দেওয়ার পরও যারা কথা শুনবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে কক্সবাজারের একাধিক হোটেল ও রিসোর্টে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের গলাচিপায় আগুনে ছাই হয়ে যায় শায়ারী, বিচ ভ্যালি ও কিংশুক ইকো রিসোর্ট। একই বছরের ২২ মে প্যাসিফিক বিচ লাউঞ্জ ইকো রিসোর্টে আগুনে তিনটি কটেজ ও একটি গুদাম পুড়ে নষ্ট হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের কর্মকর্তা সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, এখানকার বহু প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা নিয়ম একদম মানছে না। তাদের বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দেওয়া হলেও পাত্তা দেয়নি। আগুনে পোড়া টুপটুপ রিসোর্টের কোনো ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। এমন অবৈধ রিসোর্ট এখানে অগণিত।
কক্সবাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি কাশেম সিকদার টাইমসকে বলেন, এলাকায় ৫০০টির বেশি হোটেল-রেস্তোরাঁ থাকলেও তাদের সমিতিতে নিবন্ধিত মাত্র ১০০টির মতো। সব প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে গড়ে ওঠেনি এবং অনুমোদনও নেয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন করে হোটেল বানানো বা পুরনো বাসা ভাড়া নিয়ে রিসোর্ট বানানোর ধুম পড়েছে। অনেকে কোনো অনুমতি ছাড়াই রুম ভাড়া দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান টাইমসকে বলেন, পর্যটকদের সুরক্ষায় পুলিশ মাঠে আছে। বেআইনী স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে প্রশাসনকে সব ধরনের সাহায্য করবে পুলিশ।
তবে প্রশাসনের আশ্বাস সত্ত্বেও কাজের কাজ কিছু না হওয়ায় স্থানীয় ও পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক থেকেই যাচ্ছে।
সিলেট ও মৌলভীবাজার: পাহাড় কেটে রিসোর্ট বাণিজ্য
সিলেটে ৫৫০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট থাকলেও খোদ জেলা প্রশাসনের কাছেই তাদের অনুমোদনের কোনো হিসাব নেই।
সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সুমাত নুরী জুয়েল টাইমসকে জানান, সমিতির বাইরে কারা কী করছে তা তাদের জানা নেই। তাদের সমিতিতে মাত্র ২২ থেকে ২৫ জন সদস্য আছেন, যাদের সবার বৈধ লাইসেন্স আছে। তিনি পর্যটন এলাকার জন্য একটি সুস্পষ্ট নিয়ম চালুর দাবি জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ টাইমসকে জানান, যেসব রিসোর্ট বা হোটেলে অন্তত ৫০ লাখ টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগ হয়, তারা কেবল সেগুলোরই পরিবেশগত ছাড়পত্র দেন। ছোটখাটো বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা কোনো অনুমোদন দেন না।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারে প্রায় ২০০টি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণা করা হয় এবং ২০১৩ সালে শ্রীমঙ্গলে ৫ তারকা ‘গ্র্যান্ড সুলতান’ রিসোর্ট চালু হয়। কিন্তু গত তিন-চার বছরে চিত্র বদলে গেছে। ফ্ল্যাট বাসা কিংবা পাহাড়-টিলা কেটে ছোট ঘর বানিয়েই রিসোর্ট নাম দিয়ে চড়া দামে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল ট্যুরিজম সার্ভিস অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন এসব ব্যবসাকে ‘রিসোর্ট’ বলতে নারাজ। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘সঠিক মানের রিসোর্ট বলতে শ্রীমঙ্গলে বড়জোর ১০ থেকে ১২টি আছে। ২ শতক জমি কিনে দুটো রুম বানিয়ে দিলেই তো আর রিসোর্ট হয় না! অনেকে তো রিসোর্ট শব্দের মানেই বোঝে না।’
সংগঠনটির সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদও একই উদ্বেগ জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের জেলায় ২০০টি রিসোর্ট কীভাবে হলো সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তিন-চারটি রুম ভাড়া নিয়েই রিসোর্ট বলে ব্যবসা শুরু করে দিচ্ছে। এদের পেছনে কারা আছে তাও কেউ জানে না।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপার) কেন্দ্রীয় সদস্য এ এস এম সালেহ সোহেল বলেন, বন ও পাহাড় কেটে রিসোর্ট বানানোর ফলে বন্যপ্রাণীদের থাকার জায়গা নষ্ট হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো নজরদারি নেই বললেই চলে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এসব হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণে নজরদারির ঘাটতির কথা স্বীকার করেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘কে রিসোর্ট বানাচ্ছে বা কে অনুমতি দিচ্ছে তা আমার জানা নেই। রিসোর্ট নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা দরকার এবং এটার জন্য স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা উচিত।’
কক্সবাজার, সিলেট ও মৌলভীবাজারে পর্যটন ব্যবসা বাড়লেও অনুমোদন, পরিবেশ রক্ষা ও ফায়ার সেফটি নিয়ে সমন্বয়হীনতা দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হলে এখনই নিয়মিত তদারকি, স্থাপনার তালিকা তৈরি এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।


