‘স্বামী আমারে সবসময় নির্যাতন করে, আমারে নিয়া খারাপ খারাপ মন্তব্য করে। দেখেন, আমারে মাইরা কী করছে। তার নাম মাসুদ। রতিয়া রাজাপুরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বাড়ি। আমি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। নির্যাতন সইতে না পাইরা আমি আমার পথ বাইছা নিলাম। আমার এই রেকর্ড দেইখা আপনারা তার বিচার কইরেন।’
ফেসবুক লাইভে এসে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে এভাবেই নিজের কষ্টের কথা জানিয়েছিলেন শান্তা আক্তার জুই (২৬)। এর দুই দিন আগে ঘুমের অনেক ট্যাবলেট সেবন করে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি।
শনিবার রাত ১০টার দিকে শরণখোলা উপজেলা সদরের হাসপাতাল-সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসা থেকে জুইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার স্বামী মাসুদ খান পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জুই পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পত্তাসী গ্রামের এনায়েত শরীফের মেয়ে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ অক্টোবর শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পেছনে ফরিদ ফরাজীর বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে ভাড়া বাসায় ওঠেন জুই ও মাসুদ। দুই কক্ষের টিনশেড ওই বাসার মাসিক ভাড়া ছিল ৩ হাজার ২০০ টাকা।
বাড়ির মালিক ফরিদ ফরাজী জানান, ৫ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে বাসা খুঁজতে আসেন জুই ও মাসুদ। তাদের সঙ্গে একটি মেয়েও ছিল। বাসা পছন্দ হওয়ায় তারা ভাড়া নেন। এরপর থেকে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এতে অন্য ভাড়াটিয়ারা বিরক্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাদের বাসা ছেড়ে দিতে বলা হলেও তারা যাননি।
জুইয়ের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাম্পত্য কলহ ও নির্যাতনের কারণে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে ঘুমের ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। ওই সময় তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর বাসায় ফেরেন তিনি।
জুইয়ের বড় বোন জুলি বেগম জানান, প্রায় ১২-১৩ বছর আগে পারিবারিকভাবে শরণখোলার পশ্চিম রাজাপুর গ্রামের মেনাজ হাওলাদারের ছেলে কুয়েতপ্রবাসী আনোয়ার হাওলাদারের সঙ্গে জুইয়ের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে ১১ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। তবে মাসুদের সঙ্গে জুইয়ের বিয়ের বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানতেন না।
জুলি বলেন, ‘আমার বোনকে মাসুদ খুব নির্যাতন করত বলে শুনেছি। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দুই দিন আগেও সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তখন তার মেয়েকে আমরা নিজেদের কাছে নিয়ে আসি। ঘটনার সময় মেয়েটি আমাদের কাছেই ছিল। এ ঘটনায় আমরা মামলা করব।’
শরণখোলা উপজেলার ধানসাগর ইউনিয়নের ৭ নম্বর রতিয়া রাজাপুর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ সঞ্জয় কুমার মিস্ত্রি বলেন, মাসুদের বাড়ি ওই ওয়ার্ডে। তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকবার তাকে মাদকসহ ধরার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া মাসুদের বিরুদ্ধে আগে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে বলে জানান সঞ্জয় কুমার।
শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোকেয়া খানম বলেন, জুইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার কথিত স্বামী মাসুদ খান পলাতক রয়েছেন। তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
ওসি আরও বলেন, মৃত্যুর আগে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে জুইয়ের ফেসবুক লাইভে দেওয়া ভিডিও রেকর্ডটি পর্যালোচনা করা হবে। তবে এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে মাসুদ খানের মোবাইল ফোনে কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।


