ট্রাম্প আগ্রহী, কিম কেন মুখ ফিরিয়ে আছেন

ট্রাম্প আগ্রহী, কিম কেন মুখ ফিরিয়ে আছেন
উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বিভক্তকারী অসামরিকীকৃত অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৯ সালের ৩০ জুন, পানমুনজম। ছবি: এএফপি/বাসস
Advertisement
Advertisement

আগামী নভেম্বরে চীনের শেনজেনে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সমবেত হওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বৈঠকের সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হ্যানয়ে শীর্ষ বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমকে খালি হাতে ৬০ ঘণ্টার ট্রেনযাত্রা করে দেশে ফিরতে হয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি উল্টো। ট্রাম্প বারবার আগ্রহ প্রকাশ করছেন, কিন্তু পিয়ংইয়ং নীরবতা বজায় রাখছে।

গত সপ্তাহেও ট্রাম্প বলেন, আগামী মাসে এশিয়া সফরের সময় কিমের সঙ্গে তার বৈঠক ‘হতে পারে’ এবং এমন বৈঠক ‘রোমাঞ্চকর হবে’।

সিউল থেকে এএফপি জানিয়েছে, তবে সোমবার তিনি বলেন, ‘আমি জানি না… কেউ বৈঠকের জন্য অনুরোধ করছে কি না, সে বিষয়েও আমি নিশ্চিত নই।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, কিম জং উনের সঙ্গে আমার ‘সম্পর্ক খুব ভালো’।

দুই নেতার মধ্যে যেকোনো বৈঠক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করবে। তবে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য আলোচনার ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য অর্জনে ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পরিবর্তনশীল অবস্থানের জন্য পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করছেন। বিপরীতে, ট্রাম্পের সঙ্গে আরেকটি বহুল আলোচিত বৈঠক থেকে কিমের লাভবান হওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে সহায়তা করতে সেনা ও অস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কিম রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন। এতে পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলায় দেশটি সুবিধা পেয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাই মাসের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি টানা তৃতীয় বছরের মতো ৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। পিয়ংইয়ংয়ের রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণকে এর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে ব্যাংকটি।

ওয়াশিংটনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনও উত্তর কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। দেশটির জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার অন্যতম প্রধান উৎস বেইজিং।

কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম উল-চুল এএফপিকে বলেন, ‘আমি বৈঠকের সম্ভাবনা প্রায় দেখতেই পাচ্ছি না।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে কিম জং উনের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখাই সবচেয়ে ভালো বিকল্প।’

আরও পড়ুন

এদিকে, গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কাং কিয়ং-হোয়া বলেন, কিম ও ট্রাম্পের বৈঠকের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয়নি।

‘প্রেমে পড়েছিলাম’

ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে তিনবার কিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। এক পর্যায়ে তাদের সম্পর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, আমরা ‘প্রেমে পড়েছিলাম’। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের এসব শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এরপর থেকে উত্তর কোরিয়া তার অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের কাজ অব্যাহত রেখেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনামূলকভাবে নমনীয় প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং বারবার কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই পিয়ংইয়ংকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। গত সেপ্টেম্বরে তিনি প্রস্তাব করেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি অবিলম্বে পুরোপুরি বিলুপ্ত করার পরিবর্তে তা স্থগিত রাখার বিষয়ে ওয়াশিংটনের আলোচনা করা উচিত।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ উত্তর কোরিয়াকে কার্যত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। একই সঙ্গে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার পরিত্যাগ না করেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুযোগ পেতে পারে পিয়ংইয়ং।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতাকে পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়ার দিকে এগিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গত জুনে পিয়ংইয়ংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আতিথ্য দেন কিম। এর অল্প কিছুদিন আগে শি বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও পুতিনের সঙ্গে পরপর দুটি শীর্ষ বৈঠক করেন।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে পিয়ংইয়ং বা বেইজিং–কোনো পক্ষের সরকারি বিবৃতিতেই কিছু বলা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি চীনের নীরব সম্মতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিন এএফপিকে বলেন, ‘একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এবং অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া, চীন ও রাশিয়াকে নিয়ে দুটি পৃথক জোটে বিভক্তি উত্তর কোরিয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করছে।’

‘নির্বোধ’

পিয়ংইয়ং বারবার স্পষ্ট করেছে, তারা আর পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত নয়।

কিমের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং গত সেপ্টেম্বরে বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান ‘চূড়ান্ত’। দেশটির পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আশা যারা করেন, তাদের তিনি ‘নির্বোধ’ বলে অভিহিত করেন।

অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরীয় অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ভ্লাদিমির তিখোনভ এএফপিকে বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বিলুপ্ত হবে না–এই বাস্তবতাকে ভিত্তি ধরে ওয়াশিংটন আলোচনা শুরু করবে কি না, সেটিই আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা যথেষ্ট বলেই আমি মনে করি।’

বিশ্লেষকদের মতে, পিয়ংইয়ং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালনের ওপরও চীনের প্রভাব অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে শেনজেনে ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে সরাসরি কোনো সমঝোতা হলে এবং তাতে বেইজিংকে পাশ কাটানো হলে, উভয় পক্ষের ওপর চীনের প্রভাব কমে যেতে পারে।

উত্তর কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন বলেন, ‘পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্মতি নিয়েই সংলাপ এগিয়ে নেওয়া হতে পারে।’

তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়ায় সময় ও কৌশলগত গতিপ্রবাহ এখন কিমের অনুকূলে রয়েছে।

ইয়াং বলেন, ‘এসব সুবিধা ছেড়ে দেওয়া, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনিশ্চিত সংলাপে প্রবেশ করা–এই মুহূর্তে এমনটা কল্পনা করাও কঠিন।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad