নামে পরিবেশবান্ধব, বাস্তবে চরম বিপজ্জনক

নামে পরিবেশবান্ধব, বাস্তবে চরম বিপজ্জনক
প্র্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে ঘুরতে এসে ক্রমশ নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ছেন পর্যটকেরা। ‘পরিবেশবান্ধব’ নাম দিয়ে চালানো অনেক আবাসিক হোটেল-মোটেল-কটেজ-রিসোর্টে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। এর পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চুরি-ছিনতাই ও নানা ধরনের প্রতারণা।

ছুটি কাটাতে প্রতিদিন এই সাগরের শহরে আসেন হাজার হাজার মানুষ। তাদের অনেকেই ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকের কারবার, ব্ল্যাকমেইলিং (হানি ট্র্যাপ) ও নানা রকম জালিয়াতির শিকার হচ্ছেন।

কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি রিসোর্ট ও কটেজগুলো দেখতে সুন্দর এবং এতে ‘পরিবেশবান্ধব’ ছাপ মারা থাকলেও এগুলোর অনেকগুলোই চরম বিপজ্জনক। প্রতিদিন শত শত গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার বিদ্যুৎ সংযোগগুলোও একদম এলোমেলো ও ঝুঁকিপূর্ণ। বেশিরভাগ হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ কিংবা রেস্তোরাঁয় আগুন নেভানোর কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। এমনকি নেই সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা।

এমন অবহেলার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হলো গত শনিবার। ইনানীর ‘টুপটুপ রেস্তো ও রিসোর্টে’ ভয়াবহ আগুনে পুড়ে মারা যান ১০ জন পর্যটক। আগুন লাগার পর তারা আর বের হওয়ার পথ পাননি।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ টাইমসকে জানান, ২০টির কম রুম থাকা হোটেল বা ৩০ লাখ টাকার কম বাজেটের রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে পরিবেশের ছাড়পত্র লাগে না।

তিনি বলেন, ব্যবাসায়ীরা এই নিয়মের সুযোগ নিচ্ছেন। আবার যাদের বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র নেওয়ার কথা, তারাও ছাড়পত্র ছাড়া ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মাহমুদ মোর্শেদ জানান, গত এক বছরে পরিবেশের ছাড়পত্র না থাকায় ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া সংরক্ষিত পরিবেশ এলাকায় গড়ে ওঠা ১০০টিরও বেশি হোটেলের বিরুদ্ধে আরও ২৮টি মামলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ২০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের আবেদন করলেও মাত্র ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ঠিকঠাক পাওয়া গেছে।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য পরিবেশের ছাড়পত্রসহ ১৮ থেকে ২৪টি সরকারি সংস্থার অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেকেই তা মানছেন না। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ফায়ার সেফটির লাইসেন্স এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা জেলা প্রশাসনের কোনো অনুমতির তোয়াক্কাই করে না।

আগুনে বেরিয়ে এল তদারকির ব্যর্থতা

টুপটুপ রিসোর্টের ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর রিসোর্ট মালিকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আইন ভাঙার এই মহোৎসব আর প্রতারণা এতদিন ধরে কীভাবে চলতে পারল? কক্সবাজার পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মোহাম্মদ আলী কর্তৃপক্ষের এমন ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটলেই শুধু প্রশাসন নড়েচড়ে বসে আর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তার আগে তারা কোথায় থাকে? ট্যুরিজম সেল, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির মতো এত এত কমিটি থেকে লাভ কী, যদি তারা কাজই না করে?’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. এ মান্নান টাইমসকে জানান, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

তিনি জানান, কমিটির দেওয়া সুপারিশ পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং মন্ত্রণালয় যে নির্দেশ দেবে, প্রশাসন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

টেকনাফমুখী প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে ১৫০টিরও বেশি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ইনানীর পাটুয়ারটেক পথেই টুপটুপ রিসোর্টসহ হোটেল-রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ রয়েছে১০০টির বেশি। আর পুরো জেলা জুড়ে এই সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে।

আইন অনুযায়ী সাগর সৈকত থেকে ৩০০ মিটার ভেতরে এবং সৈকতের বাইরে ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনো কিছু নির্মাণ করা নিষেধ। অথচ অনেক রিসোর্ট পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতে নির্মাণ করা হয়েছে।

অধিকাংশ ব্যবসায়ী শুধু স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের একটি ট্রেড লাইসেন্স সম্বল করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম টাইমসকে বলেন, ‘রিসোর্ট ও কটেজগুলো কোনো নিয়মনীতি মানে না। সে কারণেই আমরা এদের আমাদের সমিতিতে নিইনি। পর্যটন শিল্পকে বাঁচাতে এদের একটি সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায় আনা প্রশাসনের জরুরি দায়িত্ব।’

ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, লাইসেন্স নেওয়ার আগ্রহ আরও কমেছে। তিনি বলেন, ‘চলতি বছর মাত্র ৫০টি হোটেল লাইসেন্স নবায়ন করেছে, যদিও ১০০টি আবেদন জমা পড়েছে। আগে প্রায় ২০০টি হোটেলের লাইসেন্স ছিল। নিয়ম না মানায় আমরা বেশিরভাগ হোটেলকে নোটিশ পাঠিয়েছি।’

জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোর্শেদ হোসেন জানান, টুপটুপ রিসোর্টকে বারবার সতর্ক করা হলেও তারা শোনেনি। তিনি বলেন, ‘আমরা দুইবার টুপটুপ রিসোর্টকে সতর্ক করে নোটিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কোনো পাত্তা দেয়নি এবং আগুন নেভানোর ব্যবস্থাও করেনি।’

নিত্যদিনের জালিয়াতি ও অপরাধের ফাঁদ

অনিরাপদ হোটেলের পাশাপাশি কক্সবাজারের পর্যটকদের ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রতারক চক্রের কারণে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়।

এমনকি স্পা সেন্টারগুলোতে পর্যটকদের গোপনে ভিডিও করে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও রয়েছে।

সুগন্ধা বিচ এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিদিন এই শহরে অন্তত ৫০ হাজার পর্যটক আসেন। কিন্তু এখন অপরাধ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারা জানান, মাদকের কারণেই অপরাধ বাড়ছে। মিয়ানমার থেকে আসা কিছু রোহিঙ্গা স্থানীয় অপরাধীদের সঙ্গে মিলে এই সিন্ডিকেট চালাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখানে আন্তর্জাতিক চক্রের সন্ধানও পেয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট এবং কলাতলীর হোটেল সি প্যালেসে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

তাদের কাছ থেকে প্রায় দুই হাজার আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ এবং চীনা পুলিশের লোগো ও ব্যাজ উদ্ধার করা হয়।পরে জানা যায়, এই চক্রটি মূলত তিনটি দেশের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের প্রতারণা চালাচ্ছিল। মাদক পাচার আর নিজেদের মধ্যে এলাকা দখলের লড়াইয়ে মাঝে মাঝেই গোলাগুলি ও খুনাখুনির ঘটনা ঘটছে।

শহরের গলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায় ছিনতাইকারী গ্যাং। এ ছাড়া সৈকত ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে ডাকাতি, হয়রানি, মানুষকে জিম্মি করা এবং নারীদের ওপর নির্যাতনের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশেপাশে মুক্তিপণের জন্য অপহরণের ঘটনাও ঘটে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান টাইমসকে জানান, সব অপরাধের মূলে রয়েছে মাদক। তিনি বলেন, ‘খুন, ছিনতাই, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অসামাজিক কাজ, হানি ট্র্যাপ, কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে অস্ত্রের কারবার—সবকিছুর পেছনেই মাদক।’

মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে স্থল ও জলপথে অনায়াসে মাদক ঢুকছে, আর ইয়াবা কারবারের মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।

ঝাউবন এলাকার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রিকশাচালক মো. হাসান জানান, অনেক রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে গিয়ে ইজিবাইক, টমটম, লেগুনা, সিএনজি ও চান্দের গাড়ি চালানো শুরু করেছে।

তার অভিযোগ, এদের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রে কিছু তরুণীও রয়েছে, যারা ছিনতাই, প্রতারণা ও জিম্মি করে টাকা আদায়ের কাজ করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. মিজানুর রহমান টাইমসকে জানান, তারা ওই অঞ্চলে রোহিঙ্গাসহ ২০০ জন মাদক কারবারিকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আরও জানান, তালিকায় থাকা অনেকের বাবা বাংলাদেশি হলেও মা রোহিঙ্গা।

তবে ট্যুরিস্ট পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট নিশাত অ্যাঞ্জেলা জানান, পর্যটকদের সুরক্ষায় সাহায্য কেন্দ্র ও টহল দল সক্রিয় রয়েছে। তিনি বলেন, কোনো পর্যটক বিপদে পড়ে খবর দিলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ গিয়ে ব্যবস্থা নেয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad