বাংলাদেশের পরিবারগুলো ক্রমেই গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। পরিবারের গড় ঋণ সঞ্চয়ের চেয়ে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ অর্থ ব্যয় করছে।
নতুন এক জাতীয় গবেষণায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকের আড়ালে সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকটের এই চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশে পরিবারপ্রতি গড় ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৩ টাকা, বিপরীতে সঞ্চয় ১ লাখ ৩০ হাজার ৭২৮ টাকা। অর্থাৎ ঋণ ও সঞ্চয়ের মধ্যে ব্যবধান ৫৮ হাজার ৩০৫ টাকা। একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। মাস শেষে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা।
শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডায়নামিকস অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
২০২৫ সালের ৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের ভিত্তিতে গবেষণাটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশের ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে দুটি পরিসংখ্যান ভিন্ন সময়ে পরিচালিত পৃথক জরিপের ভিত্তিতে তৈরি।
পিপিআরসির গবেষণায় গ্রামে দারিদ্র্যের হার পাওয়া গেছে ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা শহরের ১৯ দশমিক ৬৬ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। তবে আর্থিক সংকট কেবল দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গবেষকেরা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা কিন্তু অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা অন্য কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় আবার দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
পিপিআরসির হিসাবে, দেশে এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ। অর্থাৎ সীমিত অর্থনৈতিক অগ্রগতিও একটি আকস্মিক সংকটে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি আরও নাজুক। এসব পরিবারের মাসিক গড় আয় মাত্র ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা, অথচ ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি থাকে ৩ হাজার ৮১৭ টাকা।
তাদের গড় ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ৭৬৭ টাকা, যা ১৯ হাজার ৭৩৭ টাকার গড় সঞ্চয়ের তিন গুণেরও বেশি। এই পরিসংখ্যান বলছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই পরিবারগুলোকে ক্রমবর্ধমানভাবে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশই যায় খাবারের পেছনে। গ্রামে এই হার ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ফলে চিকিৎসা, শিক্ষা, জরুরি প্রয়োজন কিংবা সঞ্চয়ের জন্য অর্থ রাখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। ঋণের ব্যবহারেও সংকটের গভীরতা স্পষ্ট।
পরিবারগুলোর নেওয়া মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ভোগের প্রয়োজনে। আরও ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ নেওয়া হয়েছে দোকান থেকে বাকিতে ভোগ্যপণ্য কেনার জন্য। চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং বাড়ি নির্মাণ বা মেরামতে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ।
অর্থাৎ সরাসরি ভোগ, দোকানের বাকি ও চিকিৎসার প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়েছে মোট ঋণের ৪৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে চিকিৎসা ব্যয়।
জরিপে দেখা গেছে, ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারে অন্তত একজন দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত সদস্য রয়েছেন। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। এসব সংকটের ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশের পেছনে ছিল চিকিৎসা ব্যয়।
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, চিকিৎসায় নিজের পকেট থেকে বিপুল ব্যয় এবং সীমিত সঞ্চয়ের কারণে অনেক পরিবার বারবার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়ছে।
সরকারি সহায়তাও এই চাপ কমাতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না। গবেষণা অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এসেছে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার। কিন্তু পরিবারের গড় আয়ে সরকারি সহায়তার অবদান ১ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে, বেসরকারি সহায়তার অবদান ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে চলবে না। সাধারণ পরিবারের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জীবনযাত্রার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
পরিবারের আর্থিক সংকটের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাঠামোগত দুর্বলতার সম্পর্কও উঠে এসেছে গবেষণায়।
২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৭৮ লাখ থেকে ১ কোটি ১৭ লাখে পৌঁছেছে। কিন্তু একই সময়ে কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, ২ কোটি ৪৫ লাখ থেকে ৩ কোটি ৬ লাখে।
ফলে প্রতিষ্ঠানপ্রতি গড় কর্মসংস্থান ৩ দশমিক ১ জন থেকে কমে ২ দশমিক ৬ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যত দ্রুত বেড়েছে, সেই হারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি।
আরেকটি বড় সমস্যা পর্যাপ্ত কাজের অভাব। জরিপের আগের সপ্তাহে কর্মরত প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করেছেন।
নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। কর্মরত নারীদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করেছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৮ দশমিক ১ শতাংশ।
এসব তথ্য দেখায়, শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন। কাজ থাকলেই যে পর্যাপ্ত কর্মঘণ্টা কিংবা আয় নিশ্চিত হচ্ছে, তা নয়।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেমে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী না করে দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বাইরের ধাক্কা কাঠামোগত সমস্যাগুলোকে আরও তীব্র করে তোলে। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতাকে দেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে বিলম্ব করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।’
তিনি ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, জ্বালানি সমস্যার সমাধান, সরকারি ঋণের সতর্ক ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে নিরাপদ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত থাকলেও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই খাতের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ।
এই বৈষম্য দূর করতে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে কৃষির সংযোগ শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক দেশের রপ্তানি খাতে বহুমুখীকরণের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বাড়তি সহায়তা এবং উদ্যোক্তাদের সামনে থাকা প্রশাসনিক বাধা কমানোর আহ্বান জানান।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, সরকারি সেবাব্যবস্থার দুর্বলতা সামাল দিতে পরিবারগুলোকে ক্রমাগত ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। অথচ এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক সময় মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
‘ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ও ত্যাগের নামে আসলে নিজেদেরই শোষণ করা হচ্ছে,’ বলেন তিনি। বিদ্যমান ব্যবস্থার সামান্য সংস্কার করে সংকট সমাধানের চেষ্টারও সমালোচনা করেন ফারাহ কবির।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থাকে জোড়াতালি দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।’তার মতে, পরিবর্তনের দাবি উঠলে ছোটখাটো সংশোধন কেবল ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ লাগানোর মতো কাজ করে। প্রয়োজন পুরো ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন।
তিনি জবাবদিহি জোরদার, বিনা পারিশ্রমিকের পরিচর্যামূলক কাজের স্বীকৃতি, সাশ্রয়ী শিশুযত্নসেবা ও নারীবান্ধব সরকারি সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত করে এমন পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থার সংস্কারও প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।
গবেষণাটি এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে, যেখানে পরিবারের ঋণের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে দৈনন্দিন ভোগ ও চিকিৎসায়, অসুস্থতা হয়ে উঠছে আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ছে না।
কোটি মানুষের কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ সম্পদ গড়ে তোলা নয়, মাসের আয় দিয়ে মাসের খরচ চালানো।
গড়ে একটি পরিবারের মাস শেষে মাত্র ৭০ টাকা উদ্বৃত্ত থাকায় সামান্য আর্থিক ধাক্কাও ইতিমধ্যে চাপে থাকা সংসারের বাজেটকে ঘাটতির মুখে ঠেলে দিতে পারে।


