মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একটি মিটারগেজ যাত্রীবাহী বগির দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ বাড়িয়ে কেনার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন ২০০টি বগির প্রতিটির পেছনে খরচ ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অথচ ২০২৪ সালে ভারত থেকে কেনা ব্রডগেজ বগির দাম পড়েছিল ৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
দুই বছরে ডলারের দাম মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশ বাড়লেও বগিপছু খরচ একলাফে ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বাড়িয়ে প্রাক্কলন করায় রেলের এই কেনাকাটা প্রকল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক।
শুধু বগির দামই নয়, ৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পে নকশা যাচাই ও তদারকির নামে ৫১ কোটি টাকার বেশি ‘পরামর্শক ফি’ রাখা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। গত রোববার অনুষ্ঠিত প্রজেক্ট ইভালুয়েশন কমিটির (পিইসি) সভায় কমিশন এই খাতের খরচ ছেঁটে ফেলার কড়া নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) প্রধান অর্থায়নকারী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কোনো চূড়ান্ত সম্মতিপত্র না থাকায় নথিপত্রের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অবিলম্বে তা জমা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে ২০০টি যাত্রী বগি ছাড়াও ট্রেনের উদ্ধারকাজের জন্য ৪টি ভারী ক্রেন এবং ৪টি আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ মেশিন কেনা হবে। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১ হাজার ১২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং এডিবির ঋণ থেকে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা জোগানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
খরচ বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় রেল মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ শাকিল উদ্দিন আহমেদ জানান, ব্রডগেজের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে মিটারগেজ বগির প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কম। তাছাড়া ভারত থেকে পরিবহন খরচ কম হলেও দক্ষিণ কোরিয়া বা দূরপ্রাচ্যের দেশ থেকে বগি আমদানিতে জাহাজ ভাড়া অনেক বেশি পড়ে।
তবে এই প্রাক্কলনটি চূড়ান্ত নয় দাবি করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চূড়ান্ত দর অনেকটাই কমে আসবে। আর বিশাল এই প্রকল্পের তদারকিতে বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হলেও কমিশনের নির্দেশ মেনে পরামর্শক ফি কমানোর কাজ চলছে।
এদিকে রেলের নিজস্ব নথি অনুযায়ী, বহরে থাকা ১ হাজার ২৮২টি মিটারগেজ বগির মধ্যে ৬৮১টিই বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে বিপজ্জনকভাবে চলছে। নিয়ম অনুযায়ী বগির আয়ুষ্কাল ৩৫ বছর হলেও বহরের ৬৯৫টি বগিই এই মেয়াদ পার করে ফেলেছে। নতুন বগির সংকট থাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এসব বগি বসিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে কক্সবাজার রুটসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে গত পাঁচ বছরে ১০৪টি নতুন ট্রেন চালু হওয়ায় বগির চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে।
পুরো দেশের রেলপথ ব্রডগেজে উন্নীত না করে বারবার মিটারগেজেই কেন হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত সচিব জানান, দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিস্তৃত মিটারগেজ লাইন সচল রাখতে এবং নতুন কেনা ইঞ্জিনগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এসব বগি কেনা জরুরি হয়ে পড়েছে। সারা দেশের রেল অবকাঠামো একযোগে আধুনিকায়ন করতে যে বিশাল পুঁজি প্রয়োজন, তা রাতারাতি যোগাড় করা সম্ভব নয়।


