নগদ অর্থের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার কারণে বছরে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ব্যয় হচ্ছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
তবে এই পুরো অর্থ সরাসরি ব্যয় নয়। এর মধ্যে নগদ ব্যবস্থাপনার প্রত্যক্ষ খরচের পাশাপাশি হাতছাড়া হওয়া কর রাজস্ব, ভোক্তার সময়ের সুযোগব্যয়, হাতে নগদ রাখায় সুদ না পাওয়া এবং চুরি বা অর্থ হারানোর ঝুঁকিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কমপারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণাটিতে নগদনির্ভরতার মাথাপিছু বার্ষিক অর্থনৈতিক খরচ ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা ধরা হয়েছে। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে তা ৩৪৮ টাকা।
ছায়া অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতিসহ হিসাব করলে নগদের অর্থনৈতিক খরচ ডিজিটাল পেমেন্ট নির্ভরতার তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বেশি। ছায়া অর্থনীতির ক্ষতি বাদ দিলেও নগদের খরচ প্রায় ১২ গুণ বেশি থাকে।
মোট ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার হিসাবের সবচেয়ে বড় অংশ, ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, ছায়া অর্থনীতির কারণে সম্ভাব্য সরকারি রাজস্ব হারানোর সঙ্গে যুক্ত। এটি জিডিপির ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
অর্থাৎ, এই অংশটি নগদ নোট ছাপানো, পরিবহন বা ব্যবস্থাপনার খরচ নয়, বরং নগদভিত্তিক অপ্রকাশিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সম্ভাব্য কর রাজস্ব না পাওয়ার হিসাব।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নগদনির্ভরতার বার্ষিক খরচ প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা মোট হিসাবের ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর মধ্যে শাখা অবকাঠামো, নিরাপত্তা, নগদ পরিবহন ও অর্থ ব্যবস্থাপনার খরচ রয়েছে।
ভোক্তাদের ওপর অর্থনৈতিক বোঝা প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, বা মোটের ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এতে নগদ অর্থ তুলতে ও ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হওয়া সময়, হাতে নগদ রাখায় সুদ না পাওয়া, চুরি বা অর্থ হারানোর ঝুঁকি এবং আর্থিক সেবাদাতা ও এজেন্টদের দেওয়া ফি অন্তর্ভুক্ত।
নগদ অর্থ সংগ্রহে সময় ব্যয়ের সুযোগমূল্য ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, সুদ না পাওয়ার ক্ষতি ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বলে হিসাব করা হয়েছে।
খুচরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নগদ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও সময়জনিত খরচ প্রায় ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ ব্যবস্থাপনা খরচ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং ভোগ্যপণ্যের খুচরা বিক্রেতাদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
ছায়া অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি বাদ দিলে নগদ ব্যবহারের অর্থনৈতিক খরচ নেমে আসে প্রায় ৭৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকায়, যা জিডিপির ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
বাংলাদেশে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার খরচ শুরু হয় ব্যাংক নোট ছাপানোর কাঁচামাল আমদানি থেকে। এর সঙ্গে নোট ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা, বাজারে সরবরাহ এবং পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট প্রতিস্থাপনের খরচ যুক্ত হয়।
এত অর্থনৈতিক লোকসান সত্ত্বেও বাংলাদেশে নগদের ব্যবহার গভীরভাবে প্রোথিত। ভোক্তা নগদ ব্যবহার করেন কারণ ব্যবসায়ীরা তা গ্রহণ করেন, আবার ব্যবসায়ীরা নগদে লেনদেন করেন কারণ পাইকারি বিক্রেতা ও সরবরাহকারীরাও একইভাবে লেনদেন করেন।
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের খুচরা লেনদেনের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখনো নগদে হয়।
ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার ঠেকিয়ে রেখেছে মার্চেন্ট ফি, অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে দুর্বল আন্তঃসংযোগ, অনির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রতারণার ঝুঁকি এবং সীমিত ডিজিটাল আর্থিক জ্ঞান।
গবেষণায় উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র ২৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আর্থিকভাবে সচেতন এবং মোবাইল আর্থিক সেবার প্রায় অর্ধেক ব্যবহারকারী নিজের হিসাব স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে পারেন না।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল লেনদেনের ফি নিয়ে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ, তা তাদের সীমিত মুনাফায় চাপ ফেলে। ব্যক্তিগত মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাবে ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট এবং ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে অর্থ পাঠানোর দৈনিক সীমা ৫০ হাজার টাকা।
কার্ডভিত্তিক লেনদেনের অর্থ সাধারণত পরের দিন নিষ্পত্তি হয়, ফলে ব্যবসায়ীদের চলতি মূলধন পাওয়ায় বিলম্ব হয়।
আন্তর্জাতিক তুলনায়, ছায়া অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট ক্ষতি বাদ দিলে বাংলাদেশের নগদ ব্যবহারের খরচ অন্যান্য নগদনির্ভর উন্নয়নশীল অর্থনীতির কাছাকাছি।
বাংলাদেশে নগদের খরচ জিডিপির ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যেখানে ভারতে তা ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে মাথাপিছু হিসাবে বাংলাদেশে খরচ প্রায় ৩৭ ডলার, ভারতে ২১ ডলার এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ১০৬ ডলার।
চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদবিহীন লেনদেনের উদ্যোগ আরও জোরদার করার আগে মে মাসে গবেষণাটি করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নগদের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারলে অর্থনীতিজুড়ে লেনদেনের খরচ কমানো এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব। তবে সে জন্য ডিজিটাল পেমেন্টকে আরও সাশ্রয়ী, দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও সহজ করতে হবে।


