উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যের কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার পরিকল্পনা করছে। এতে করে আর্থিকভাবেও দেশ লাভবান হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা কেবল টিউশন ফি হিসেবে দিতে হচ্ছে, দেশেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে সেই চাপও কমবে বলে আশা করছে তারা।
এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা মালিকানার শেয়ার নিতে পারলেও দেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতা থাকা চলবে না।
ইউজিসি এও বলেছে, বিদেশি হলেই যেনতেন প্রতিষ্ঠানকে আসতে দেওয়া হবে না, যাদের উচ্চশিক্ষায় র্যাংকিং ভালো বা যাদের সুনাম আছে, গবেষণায় ভালো, এমন প্রতিষ্ঠানই ক্যাম্পাস চালুর অনুমতি পাবে।
আবার এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক দেশি শিক্ষক নিয়োগের বিধান থাকছে। এতে করে এই শিক্ষকদের মানোন্নয়ন হবে বলেও মনে করছে ইউজিসি।
এরই মধ্যে নীতিমালার একটি খসড়া করা হয়েছে; বিভিন্ন অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের কাজ শেষে নতুন বছরের শুরুতেই নীতিমালা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য ঠিক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এরপর বাংলাদেশে ক্যাম্পাস চালুর বিষয়ে আহ্বান জানাবে তারা।
দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও নিজস্ব ক্যাম্পাসই নেই অর্ধেকের বেশি, অন্তত ৯০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এমনকি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতও ঠিক নেই অন্তত অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানা হচ্ছে না ন্যূনতম অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক রাখাও শর্তও। ফলে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘বিশ্বের উন্নত দেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে বাংলাদেশে তাদের ক্যাম্পাস খুলতে চায় সেই সুযোগ তৈরি করতে চাই। কারণ, বিশ্বমানের নাগরিক তৈরি করতে হলে আন্তদেশীয় উচ্চশিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে।’
তিনি জানান, লোকাল পার্টনার বলতে মালিকানায় দেশীয় উদ্যোক্তাকে বোঝানো হবে। দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ক্যাম্পাস চালুর অনুমতি পাবে না।
‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় নিজে সরাসরি আসতে পারে, সে ক্ষেত্রে এক রকম হবে। আবার তারা লোকাল পার্টনারকেও সঙ্গে নিতে পারে, সে ক্ষেত্রে বিষয়টি আরেক রকম হবে। এসব বিবেচনায় রেখেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়ে পৃথক একটি নীতিমালার খসড়া করা হয়েছে’, ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ এই উদ্যোগকে সমর্থন করছেন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘চাকরির বাজার বিশ্লেষণ না করেই শুধু রাজনৈতিক বিবেচনা বা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সনদ পাচ্ছে কিন্তু বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন না করায় চাকরি পাচ্ছে না। দিন দিন শিক্ষিত বেকার বাড়ায় দেশে উচ্চশিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আস্থা কমে যাচ্ছে। ফলে সামর্থ্যবানরা এখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে। যদি ভালো ভালো কিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে, তাহলে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ হয়তো দেশে থেকেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ নেবে। এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে শিক্ষার মান বাড়াতে আরও সচেষ্ট হবে।’
কারা ক্যাম্পাস খোলার অনুমোদন পাবে
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক নীতিমালায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো–আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত র্যাঙ্কিংকে গুরুত্ব দেওয়া, ঐতিহাসিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও গবেষণার জন্য আলোচিত বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাধান্য দেওয়া, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল ও গবেষণার ইতিহাস পর্যালোচনা করা।
তবে কোনোভাবে শুধু ব্যাংকিংয়ের কারণেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দেওয়া হবে না, পারিপার্শ্বিক আরও প্রয়োজনীয় বিষয়াবলি বিবেচনায় থাকবে।
দেশে যেসব বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ক্যাম্পাস স্থাপন করবেন, আমাদের দেশের বিদ্যমান আইনি-বিধির আলোকে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। বাংলাদেশকে তারা কী পরিমাণ রাজস্ব দেবে বিষয়টি দেশের আইনের আলোকে এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে নির্ধারণ করা হবে।
যেসব বিষয়ে দেশে গভীর ও উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা নেই, সেসব বিষয়ে উন্নত পাঠদানে সুনাম সুনাম অর্জনকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা আছে খসড়ায়।
প্রাথমিকভাবে যেসব বিষয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই বা কম আছে, তথ্য-প্রযুক্তিগত নতুন নতুন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সেসব বিষয় খোলার অনুমোদনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
সর্বোপরি, দেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আসা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্যতা সাপেক্ষে অন্তত অর্ধেক দেশীয় শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও থাকছে চূড়ান্ত নীতিমালায়।
বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দেশীয় শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়বে বলেও ধরে নিয়েছে ইউজিসি। পরে এই শিক্ষকরা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালে শিক্ষার্থীরা যাতে উপকৃত হবে বলে মনে করছে তারা।
বাংলাদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে এমন বিষয়ে গবেষণাকেও প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা আছে খসড়ায়।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখার সার্বিক কর্মকাণ্ড দেখভালের জন্য ইউজিসিতে নতুন একটি শাখাও খোলা হবে।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবাসন এবং শিক্ষা কর্মকাণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে পৃথক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হবে। যার ফলে নতুন ইকোনমিক অ্যাভিনিউ তৈরি হবে। ক্যাম্পাসগুলোতে কেন্দ্র করে যেমন নতুন কর্মসংস্থান হবে, তেমনি সাংস্কৃতিক বিনিময় হবে। দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে ঠিক করা হবে।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) উপাচার্য মো. আবুল কাশেম মিয়া টাইমসকে বলেন, ‘ভালো কিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় যদি তাদের শাখা বা ক্যাম্পাস বাংলাদেশে চালু করে, তাহলে তা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। দেশের ভালো সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য তখন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিথক্রিয়ায় সাংস্কৃতিক বিনিময় হবে।’
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশিদের ব্যয় বাড়ছে লাফিয়ে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে বিদেশে শিক্ষার জন্য টাকা পাঠানোর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই খাতে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ ছিল ৪৩ কোটি ২ লাখ ডলার, টাকায় হিসাব করলে যা ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি।
পাঁচ বছর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে পাঠানো হয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার বা ১০ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ পাঁচ বছরে টিউশন ফি ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত খরচ হিসেবে বিদেশি মুদ্রা পাঠানোর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি চাপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম আমানুল্লাহ টাইমসকে বলেন, ‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় দেশে এলে তখন এই অর্থটা আর দিতে হবে না। বরং আশপাশের বিদেশি শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশে আসবে। তখন আমরা উল্টো রেমিট্যান্স পাব।’
আশির দশকেও মালয়েশিয়া থেকেও অনেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে আসত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন উল্টো হয়ে গেছে। মালয়েশিয়াই বরং এই অঞ্চলের অন্যতম এডুকেশন হাবে পরিণত হয়েছে। আমাদের মতো দেশ থেকে হাজারো শিক্ষার্থী প্রতি বছর পড়তে যাচ্ছে সেখানে। আমাদের সামনেও নিজেদের এডুকেশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার সেই সুযোগ আছে, সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে।’


