সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে নারীদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে আপত্তি উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজনের বিরোধিতায় ১৮ দিনের ব্যবধানে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ স্থগিত ও নারী বাউলশিল্পীদের গানের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়েছে।
এতে শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত দিরাইয়ে পরপর দুটি আয়োজনে বাধা আসায় নারীদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে প্রশাসনের দাবি, আয়োজকদের ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে অনুষ্ঠান দুটি বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে। সরকারিভাবে মেয়েদের সাংস্কৃতিক বা খেলাধুলার কোনো আয়োজন বন্ধ করা হয়নি। বরং নতুন কুঁড়িসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দিরাইয়ের মেয়েরা ভালো করছে।
নারী বাউলশিল্পীদের গানের আয়োজনে আপত্তি
গত ২২ অক্টোবর দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে নারী বাউলশিল্পীদের নিয়ে একটি গানের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে এ আয়োজন করেন। এতে স্থানীয় দুই নারী বাউলশিল্পী তানিশা ও নিলার গান পরিবেশনের কথা ছিল। এ উপলক্ষে পোস্টারও লাগানো হয়। পাশের আকিলশা বাজারের একটি দোকান থেকে মাইকসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনা হয়।
তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নারী শিল্পীদের গান পরিবেশনে আপত্তি জানান। এ নিয়ে থানায় লিখিত আবেদনও জমা পড়ে। পরে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়।
গত ২১ অক্টোবর গ্রামবাসীর পক্ষে আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর আবেদন করেন। এতে গ্রামের ধর্মীয় পরিবেশ ও ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে অনুষ্ঠান বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
আবেদনকারীদের দাবি, হাতিয়া গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা, একজন আল্লাহর অলির মাজার ও অনেক আলেম-ওলামার বসবাস রয়েছে। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের আয়োজন চললে এলাকায় উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
আবেদনকারী কামরুল হাসান মিটু বলেন, তাদের গ্রামে আগে গানবাজনার আয়োজন হলেও বর্তমানে এমন অনুষ্ঠান হয় না। গ্রামে মসজিদ-মাদ্রাসা রয়েছে। প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিলও হয়। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের উদ্যোগে গ্রামবাসীর একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এ কারণে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়ে তারা থানায় আবেদন করেন।
আয়োজক শওকত আলী বলেন, মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে ছোট পরিসরে বাউল গানের আয়োজন করেছিলেন। আপত্তি ওঠার পর থানা থেকে তাকে ফোন করা হয়। সামাজিক সম্প্রীতির কথা বিবেচনা করে তিনি অনুষ্ঠান বন্ধ রাখেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে গানের আসর বন্ধ হলেও সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনুষ্ঠানটি করা হয়।
কুলঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরার হোসেন বলেন, শওকত আলী সংস্কৃতিমনা মানুষ। তিনি দেশে এলে প্রায় প্রতিদিনই গানবাজনার আয়োজন করেন।
তিনি বলেন, প্রথমে গানের অনুষ্ঠানের কথা শুনেছিলেন। পরে সেটি বন্ধ হওয়ার খবর পান। সেদিন এলাকায় না থাকায় বিস্তারিত জানাতে পারেননি।
আপত্তিতে স্থগিত মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ
এর আগে গত ৫ অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ম্যাচটির আয়োজন করে। তবে স্থানীয় একটি পক্ষের বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি স্থগিত হয়।
ক্লাবের সভাপতি ও কোচ রাকিব আহমেদ ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, ম্যাচের আগের রাতে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গিয়ে খেলা বন্ধের দাবি জানান। পরে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর ম্যাচটি স্থগিত করা হয়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাকিব আহমেদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। তার ক্লাবের কোনো নিবন্ধনও নেই। বিভিন্ন জেলা থেকে মেয়েদের এনে তিনি খেলার আয়োজন করেন। তার আয়োজনে ফুটবল ম্যাচটি হওয়া নিয়ে একটি পক্ষের বিরোধিতা ছিল।
ম্যাচের বিরোধিতাকারী মাওলানা শরিফ উদ্দিন নিজেকে ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র সভাপতি পরিচয় দিয়ে নারীদের মাঠে খেলাধুলার আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানান।
বাইরের জেলা থেকে মেয়েদের এনে খেলা আয়োজন ও মাঠে তাদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ ধরনের খেলা দেখলে যুবকদের চরিত্রের অবনতি হতে পারে।
রাকিব আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, গত সাত বছর ধরে মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছেন তিনি। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রীতি ম্যাচটির আয়োজন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘মেয়েদের নিয়ে কোনো আয়োজনের কথা শুনলেই একটি পক্ষ বিরোধিতা করে। কেন এমন করা হচ্ছে, তা জানি না।’
নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ
দিরাইয়ে পরপর দুটি আয়োজন বন্ধ বা স্থগিত হওয়ায় সাংস্কৃতিক চর্চা ও নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা।
কেন্দ্রীয় উদীচীর সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত দিরাইয়ে বাউলগানের আসর ও মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ স্থানীয় আপত্তিতে বন্ধ বা স্থগিত হওয়া উদ্বেগজনক। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে আপত্তি উঠলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গান, সাহিত্য, খেলাধুলা ও শিল্পচর্চা সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে। কোনো আয়োজনের সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে আলোচনা ও যুক্তির পরিবর্তে চাপ সৃষ্টি করে আয়োজন বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, গানের অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি ওঠার পর পুলিশ আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেছিল। পরে আয়োজকেরা নিজেরাই গানবাজনা করবেন না বলে আশ্বস্ত করেন। এতে বিষয়টির মীমাংসা হয়।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, আয়োজকদের ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে ফুটবল ম্যাচটি বন্ধ হয়েছে। সরকারিভাবে মেয়েদের সাংস্কৃতিক বা খেলাধুলার কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়নি। বরং নতুন কুঁড়িসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দিরাইয়ের মেয়েরা ভালো করছে।


