প্রায় এক বছর দেশের বাইরে থাকার পর রোববার ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন দেশটির বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। এর আগে দেশে ফেরার একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে তার সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, দেশে ফেরার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মাচাদো লেখেন, ‘আমি এখানে আছি। আপনাদের সবার সঙ্গে।’
রোববার মাচাদোর প্রেস টিমের প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, তিনি ভেনেজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলীয় লারা রাজ্যের একটি গির্জায় উপস্থিত হয়েছেন। এক প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানান, মাচাদো গির্জা থেকে বের হয়ে একটি বড় গাড়িতে ওঠার সময় আশপাশের মানুষ জাতীয় সংগীত গেয়ে এবং ‘স্বাধীনতা’ (ফ্রিডম) স্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।
সড়কপথে রাজধানী কারাকাসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার যাত্রাপথের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকেরা জড়ো হয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন।
মাচাদোর সফর সূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র, পানামা ও কলম্বিয়ার সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। সূত্রটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রত্যাবর্তনের অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাকে জানানো হয়েছিল।
তবে রোববার হোয়াইট হাউসে মাচাদোর দেশে ফেরা সম্পর্কে অবহিত থাকার কথা অস্বীকার করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, মাচাদো নয় বরং ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকেই যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়ে যাবে।
মাচাদো সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি খুব ভালো একজন নারী। তবে ভেনেজুয়েলায় আমরা খুব ভালো করছি।’
এ বিষয়ে কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মার্কিন বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনকে মিত্র হিসেবে পাশে পাওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন মাচাদো। তবে তার দেশে ফেরার প্রচেষ্টা সেই সম্পর্ককে জটিল করেছে।
অন্যদিকে মাদুরোর সাবেক ডেপুটি ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি বারবার সমর্থন জানিয়েছেন ট্রাম্প। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর তেল উৎপাদন ও অন্যান্য ব্যবসায়িক উদ্যোগসংক্রান্ত চুক্তিরও প্রশংসা করেছেন তিনি।

গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করার সময় এখনো আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এর আগে জুন মাসে মাচাদোকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে বলেছিলেন। এরপরও তিনি কয়েকবার ভেনেজুয়েলায় প্রবেশের চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হননি।
তবে এবার কীভাবে তিনি দেশে ফিরেছেন, সে বিষয়ে তার দল বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
মাচাদোর যাত্রাপথ সম্পর্কে জানেন এমন চার ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের শেষ দিকে তিনি একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে পানামা থেকে কলম্বিয়ায় যান। এরপর রোববার স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রম করে ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করেন। যাত্রাপথে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেন।
সূত্রটির দাবি, মাচাদোর চলাচলে বাধা না দিতে এবং তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি না করতে ডেলসি রদ্রিগেজ ও ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল।
রোববার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘মাচাদোর নিরাপদে ভেনেজুয়েলায় ফেরার উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে। দেশটির সঙ্গে পুনর্মিলন আলোচনার মাধ্যমে ইতিমধ্যে শত শত রাজনৈতিক বন্দিও মুক্তি পেয়েছেন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের শত শত নেতা নির্বাসন থেকে দেশে ফিরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, সব রাজনৈতিক পক্ষ এসব আলোচনাকে সমর্থন করবে। কারণ গত ৩০ বছরের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণভাবে শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই নয়, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারও সবচেয়ে ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছে এসব আলোচনার মাধ্যমে।’
চলতি মাসে ভেনেজুয়েলার বিরোধী শিবিরের একটি অংশ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এক দফা আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে নির্বাচন আয়োজনের আগে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ও নির্বাচন পরিষদ পুনর্গঠনসহ কয়েকটি লক্ষ্য নিয়ে ওই আলোচনা হয়।
তবে এসব আলোচনায় মাচাদোর রাজনৈতিক আন্দোলনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এদিকে রোববার মাচাদো রাজধানী কারাকাসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মহাসড়কের দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। তাদের অনেকে ‘মারিয়া, আমরা তোমাকে ভালোবাসি’, ‘স্বাগতম’ এবং ‘স্বাধীনতা’ বলে স্লোগান দেন।
বারকিসিমেতো শহরে অন্য সমর্থকদের সঙ্গে আনন্দ উদ্যাপনের সময় স্থানীয় বাসিন্দা হারনান আদামেস বলেন, ‘মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন।’
দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মী জুলেইমা গ্রানাদিলো বলেন, ‘মাচাদোর ফিরে আসার অর্থ কী? আমাদের সামনে সব পথ খুলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের দরজা খুলছে। আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি এবং শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যাব।’
‘আমাদের নেত্রীর ফিরে আসার মধ্য দিয়ে এই একনায়কতন্ত্রের এরইমধ্যে অবসান ঘটেছে’, যোগ করেন তিনি।
মাচাদোর প্রধান পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ডেভিড স্মোলানস্কি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দেশে ফেরার পর মাচাদো গত জুন মাসে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা করেছেন।
এ ছাড়া রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবার, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন নেতার সঙ্গেও তিনি বৈঠক করবেন।
স্মোলানস্কি বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন।’
নিকোলাস মাদুরো সরকারের আমলে মাচাদোর ভেনেজুয়েলা ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে এক বছরের বেশি সময় মূলত আত্মগোপনে থাকার পর নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের শেষ দিকে তিনি গোপনে দেশ ছাড়েন।
মাচাদোর রাজনৈতিক আন্দোলনের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এদমুন্দো গঞ্জালেস স্পেন থেকে জানিয়েছেন, তিনিও শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় ফিরবেন এবং মাচাদোর সঙ্গে যোগ দেবেন।


