গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় কেয়া গ্রুপের চারটি কারখানায় দ্বিতীয় দফায় আরও ৭৩৯ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। গত সোমবার রাতে কারখানাগুলোর প্রধান ফটকে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের নামের তালিকা টাঙানো হয়। এ নিয়ে দুই দফায় চাকরি হারিয়েছেন ১ হাজার ৩৫২ জন
ব্যাংকিং জটিলতা, ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারা, গ্যাস বিল বকেয়া ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন দীর্ঘদিন ধরে কারখানাগুলোতে কাজ করা শ্রমিকেরা। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত প্রায় এক হাজার প্রতিবন্ধী শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়েও।
ছাঁটাই হওয়া চারটি প্রতিষ্ঠান হলো কেয়া নিট কম্পোজিট, কেয়া স্পিনিং, কেয়া কটন ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।
মঙ্গলবার সকালে ছাঁটাইয়ের খবর পেয়ে কারখানার প্রধান ফটকে জড়ো হন শ্রমিকেরা। তালিকায় নিজেদের নাম দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
কারখানাটিতে ১৯ বছর কাজ করেছেন শেলিনা বেগম। ছাঁটাইয়ের তালিকায় নাম দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। লাইলি বেগম বলেন, ‘এত বছর চাকরি করে শেষ পর্যন্ত খালি হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে।’
আরেক শ্রমিক জান্নাত আরা জানান, ১৭ বছর ধরে কারখানায় কাজ করেছেন তিনি। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
শ্রমিক আলম হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারে নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন। দ্রুত কাজ না পেলে পরিবার চালাতে অটোরিকশা চালানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
কেয়া গ্রুপের কম্পোজিট সেকশনের অ্যাডমিন কর্মকর্তা সাবরিনা ইসলাম টাইমসকে বলেন, ব্যাংকের সঙ্গে হিসাব-নিকাশের জটিলতায় ঋণপত্র (এলসি) খোলা যাচ্ছে না। ফলে কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ও পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানি করতে না পারায় ব্যাংকের পাওনা পরিশোধও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় এক হাজার প্রতিবন্ধী শ্রমিক কাজ করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের কর্মসংস্থান নিয়েও কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন।
কর্তৃপক্ষের নোটিশে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং জটিলতার পাশাপাশি গ্যাস বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে বিভিন্ন বিভাগ ও সেকশনের কিছু পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই কার্যকর করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দফায় কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৬১৩ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। এবার দ্বিতীয় দফায় আরও ৭৩৯ জনকে ছাঁটাই করা হয়েছে।
গত ৬ জুন থেকে কারখানাগুলোতে দফায় দফায় লে-অফ ঘোষণা করে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়। পাঁচবার লে-অফের মেয়াদ বাড়ানোর পর গণছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
কেয়া গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের আইনানুগ পাওনা ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। ভবিষ্যতে কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হলে ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। চাকরিতে বহাল থাকা কর্মীরা লে-অফের আওতায় থাকবেন এবং আইন অনুযায়ী সুবিধা পাবেন।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান টাইমসকে বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও উৎপাদনসংক্রান্ত সংকটের প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনে। ব্যয় কমানোর উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে চাকরি হারানো কর্মীদের। তাদের সংসার কীভাবে চলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কারখানা এলাকায় শিল্প পুলিশের পাশাপাশি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর মো. রাজিব হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও ছাঁটাইয়ের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না বলে জানিয়েছেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান বলেন, কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে ছাঁটাইয়ের বিষয়টি তাদের জানা আছে। শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের আইনানুগ পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ করা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করছে শিল্প পুলিশ।
দুই দফায় ১ হাজার ৩৫২ জন শ্রমিক-কর্মচারীর চাকরি হারানোর ঘটনায় তাদের পরিবারগুলোর জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রায় এক হাজার প্রতিবন্ধী শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের পাওনা পরিশোধ ও ভবিষ্যতে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


