পোশাক খাতের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি পর্যালোচনার জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়ার মাঝেই রাজধানীর উত্তরায় শ্রমিকদের আন্দোলন কারখানা মালিক ও শ্রমিকনেতাদের মনে নানা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
গত সপ্তাহের শুরু থেকে উত্তরায় বকেয়া বেতন মিটিয়ে দেওয়া এবং নতুন সর্বনিম্ন বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা পাঁচ দিন ধরে রাস্তা আটকে আন্দোলন করছেন শ্রমিকরা। গত শনিবারের সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন পুলিশ সদস্যসহ প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন।
অথচ গত বৃহস্পতিবারই মজুরি পর্যালোচনার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেছে। ওই দিন মালিক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধি চেয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ)।
মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মতে, যখন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তখন এভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তাদের দাবি, একটি পক্ষ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এবং পরিবেশ উত্তপ্ত করতেই এসব করছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সভাপতি মীর আবুল কালাম আজাদ টাইমসকে বলেন, সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও কারা এই আন্দোলন থামতে দিচ্ছে না, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খতিয়ে দেখা দরকার।
তিনি বলেন, ‘সরকার তো নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা বলেই দিয়েছে। এরপরও কারা এই আন্দোলন উসকে দিচ্ছে, সেটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। তাদের আসল উদ্দেশ্য কি অসন্তোষ বাঁচিয়ে রাখা, নাকি সরকারকে বিপদে ফেলা—তা খতিয়ে দেখা উচিত।’
কারখানা মালিকরাও নতুন মজুরি স্কেলের বিষয়ে একমত, তবে আন্দোলনের সময় নিয়ে তারা সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সরাসরি একটি অদৃশ্য গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তোলেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এই আন্দোলনের পেছনে যারা আছে, তারা সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলতে চায়। বিএনপি যখনই ক্ষমতায় আসে, এই গ্রুপটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবারও তারা বিএনপি সরকারকে অস্থিতিশীল করতেই মাঠে নেমেছে।’
পোশাক শ্রমিকদের সর্বশেষ সর্বনিম্ন মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে, যা কার্যকর হয় এর পরের মাসে।
আগে পাঁচ বছর পর পর মজুরি পর্যালোচনার নিয়ম থাকলেও এ বছর সরকার সেই সময় কমিয়ে তিন বছর করেছে। সে হিসাবে আগামী নভেম্বরেই তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে, তাই নতুন মজুরি ঘোষণার সময়ও হয়ে এসেছে।
শ্রম আইন অনুযায়ী, নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে হলে একজন নিরপেক্ষ সদস্যের পাশাপাশি মালিক ও শ্রমিক পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি থাকতে হয়।
এ জন্য মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছে তিনটি করে নাম চেয়েছে মন্ত্রণালয়।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে অক্টোবরের মধ্যেই নতুন মজুরি ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল আইবিসি। মন্ত্রীও চলতি মাসের মধ্যেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
এদিকে গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পোশাক খাতের কয়েকজন উদীয়মান তরুণ নেতাই মূলত উত্তরার এই আন্দোলন সামলাচ্ছেন।
পুলিশ জানায়, গত সোমবার খুব অল্পসংখ্যক শ্রমিক নিয়ে আন্দোলনটি শান্তভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, আয়োজকরা লোক বাড়াতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা সহিংসতার দিকে মোড় নেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. রেজাউল করিম জানান, মূলত ‘নিপা গার্মেন্ট’ থেকে আন্দোলনটি উসকে ওঠে। এরপর অন্য কারখানার শ্রমিকরাও এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘নিপা গার্মেন্টসের ওখান থেকেই ঝামেলা শুরু হয়, পরে তারা বাকিদেরও রাস্তায় নামিয়ে আনে। এর নেপথ্যে মাস্টারমাইন্ড কারা, তা নিয়ে গোয়েন্দারা কাজ করছেন। তদন্তের স্বার্থে এখনই নির্দিষ্ট করে কারো নাম বলা যাচ্ছে না।’
কাজের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে মজুরি বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, শ্রম মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করে শ্রমিক প্রতিনিধিদের নাম জানিয়ে দিলেই নতুন বোর্ডের কাজ পুরোদমে শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, আইনে ছয় মাসের সময় দেওয়া থাকলেও তারা তার আগেই কাজ শেষ করার চেষ্টা করবেন।
অন্যদিকে শ্রম অধিদপ্তর জানিয়েছে, নামের তালিকা পেলেই তারা দ্রুত যাচাই-বাছাই শেষ করে গেজেট প্রকাশের জন্য পাঠাবে।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুস সামাদ আল আজাদ জানান, দুর্গাপূজার ছুটির আগেই এই প্রক্রিয়া শেষ করার ইচ্ছা ছিল। তবে পূজার ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজটি চূড়ান্ত করে ফেলার আশা প্রকাশ করেন তিনি।


