রাস্তার পাশে বা ফুটপাতে খাবার দোকান দিতে হলেও সরকারের কাছ থেকে নিবন্ধনের শর্তে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নাখোশ নন, বরং এর ফলে নতুন করে ভোগান্তি তৈরি হবে কি না, চাঁদাবাজি কমবে কি না–এমন প্রশ্ন তাদের।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত জানানোর পরদিন ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে দেখা হলো আখের রস বিক্রেতা আজগর আলীর সঙ্গে। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন করতে হলে করব, এটা তো ভালো উদ্যোগ। নিবন্ধন করার পর কেউ চাঁদা নিতে আসলে বলব, আমরা সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দোকান বসাইছি, তোমাদের চাঁদা দিতে হবে কেন!’
পান্থপথে চিতই পিঠা বিক্রেতা ষাটোর্ধ্ব আমেনা বেগম আশা করছেন, তাদের ঝামেলা কমবে। চারদিন দিন আগে সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে তার দোকান তুলে দিয়েছিল। মনে শঙ্কা নিয়ে বৃহস্পতিবার তিনি ফের দোকান বসিয়েছেন।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘সরকার থেকে নিবন্ধন নিয়ে যদি দোকান চালানো যায় তাহলে তো ভালোই, আমি এতে কোনো সমস্যা দেখছি না।’
তার পাশেই বসা ছিলেন কাশেম মিয়া। তিনি জিলাপির দোকান চালাতেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের চাপে চারদিন ধরে দোকান বন্ধ। তিনি বলেন, ‘এ দেশে কত নিয়মকানুন দেখমু! সব নিয়ম শুধু গরিবের জন্য, সব সময় শুধু গরিবের পেটেই লাত্থি!’
কাওরান বাজারের শিঙাড়া, সমুচা বিক্রেতা মো. হোসেনের চিন্তিত অবশ্য প্রক্রিয়া নিয়ে। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘নিবন্ধন করতে কোথায় যেতে হবে, কীভাবে কী করতে হবে এটা তো আমাদের জন্য একটা হয়রানি। এগুলা থেকে আমাদের বাদ রাখলেই ভালো হতো।’
বুধবার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ফুটপাতে, রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, শিঙাড়া, পিঁয়াজু, ফলের রসসহ খাবারের যেকোন দোকান দিয়ে ব্যবসা করতে হলে এখন থেকে সরকারের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে।
রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টিসহ খাবারের দোকান থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিবন্ধন নিতে হবে। না হলে দোকানিদের শাস্তি পেতে হবে।
শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাবারের ব্যবসা, স্বাস্থ্যসহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য ও নিউট্রাসিউটিক্যালের মতো খাবার তৈরির ব্যবসার জন্য নিবন্ধনের পাশাপাশি লাইসেন্সও নিতে হবে।
আগামী আগামী ১ নভেম্বর থেকেই নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন শুরু হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘ভাসমান দোকানগুলোকে প্রথমবারেই আমরা নিবন্ধনের আওতায় আনব না। আবেদন করার পর আমাদের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে তথ্য যাচাই করবেন এবং এরপর তাদেরকে লাইসেন্স দেওয়া হবে।’
ভাসমান ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের জন্য আমরা কোনো ফি থাকবে না বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
ফুটপাতের দোকানিরা এই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও নাখোশ বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এই নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রক্রিয়াটা এতটা জটিল যে এটা করতে গেলেই লেনদেন আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সরকার করপোরেটদের ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য এমন একটা বন্দোবস্ত করছেন যেন ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা ব্যবসা না করতে পারে। এসব করে তাদের হাত পা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।’
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এর সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মনে করেন, নিবন্ধনের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য তৈরির বিষয়ে শর্ত থাকলে সেটি খাদ্যের মান উন্নত করতে সহায়ক হবে।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনার জন্য এটার প্রয়োজন আছে।’
তবে এই নিবন্ধন বা লাইসেন্স করতে গিয়ে যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি পোহাতে না হয়, অথবা ঘুষ, মাসোহারা দিতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করারও তাগিদ দিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই সচিব।


