দিল্লি সফরের আগে উত্তাপ কমতে দিন

দিল্লি সফরের আগে উত্তাপ কমতে দিন
Advertisement
Advertisement

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশিত দিল্লি সফর ঘিরে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

ভারতে একটি সরকারি সফর হবেই–তা এখন হোক, কয়েক মাস পর হোক কিংবা এক বছর পর। যেহেতু দুটি রাষ্ট্রই প্রতিবেশী, তাই সময়সীমা যাই হোক না কেন, এ ধরনের মুখোমুখি আলোচনা ও যোগাযোগ অনিবার্য।

প্রশ্নটি অবশ্য অন্য জায়গায়–এই সফর কি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে, নাকি হবে না? সফরটি নিয়ে আলোচনার মাঝেই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নিয়ে দুই দেশের সব শ্রেণির মানুষই কথা বলছেন। সাধারণ চোখেই স্পষ্ট, গত ৫ আগস্ট ভারতের মাটি থেকে একটি নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দল ও তার শীর্ষ নেতৃত্বকে যদি প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া না হতো, তবে হয়তো এই সফর নির্ধারিত সময়েই হতো।

৫ আগস্টের ওই ঘটনার পর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আর সরল বা স্পষ্ট জায়গায় নেই, এখানে একাধিক জটিল সমীকরণ যুক্ত হয়েছে। সেদিনের সেই সংবাদ সম্মেলনের প্রভাব যেমন এখনো কাটেনি, তেমনি ভারতের কয়েকজন সাবেক কূটনীতিকের একের পর এক বক্তব্য আগুনে ঘি ঢালছে।

কে কী বলেছেন তার বিস্তারিত বিবরণে না গিয়েও বলা যায়, ভারতীয় সাবেক কূটনীতিকদের একটি বড় অংশের বার্তার মূল সুর হলো—তারা বাংলাদেশে আমূল পরিবর্তন আনা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পেছনের সামাজিক-রাজনৈতিক কারণগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছেন বা খাটো করে দেখছেন। অবশ্য গুটি কতক বস্তুনিষ্ঠ কণ্ঠও রয়েছে, যারা নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিয়ম ও নানাবিধ অব্যবস্থাপনাকে এই গণঅভ্যুত্থানের আসল কারণ হিসেবে স্বীকার করেছেন। তবে সামগ্রিক আলোচনায় একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি।

মাঠের বাস্তবতা ও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগে বাংলাদেশের মানুষের মনের ক্ষোভকে এড়িয়ে করা এসব মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে আবার উষ্ণতা ও বন্ধুত্ব ফিরিয়ে আনতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

আরও পড়ুন

আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনেও রয়েছে প্রচুর মিল। তাই প্রতিবেশীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদৃঢ় সম্পর্কের স্বার্থে উভয় পক্ষকে আন্তরিকতার সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব মিটিয়ে ফেলতে হবে। এর জন্য শুধুই সুন্দর কথা না বলে, তা কাজে করে দেখাতে হবে।

বর্তমান এই মুহূর্তটিতে সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট। ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনটি হতে দেওয়ার আগে এর নেতিবাচক পরিণতির কথা নিশ্চয়ই ভেবে দেখা উচিত ছিল। অথবা এমন ভাবনাও থেকে থাকতে পারে যে, ঘটনাটি ঘটুক, তারপর যা হওয়ার সামাল দেওয়া যাবে। তবে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার কৌশল প্রাচীন যুগে কাজ করলেও আধুনিক ভূরাজনীতিতে ‘ভেবেচিন্তে কাজ করা ও শান্ত থাকা’ই বুদ্ধিমানের কাজ।

না ভেবে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার খেসারত গোটা বিশ্ব কীভাবে দিচ্ছে, তা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তাদের এই দ্বন্দ্ব এখন পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে, তাতে এ কথা পরিষ্কার যে শুধু আলোচনা দিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরবে না; এর জন্য উভয় পক্ষকে কিছু ছাড় দিতেও রাজি থাকতে হবে। ভারতের এক প্রবীণ কূটনীতিক সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ভারতে থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে যাননি, বরং তার সুরক্ষার স্বার্থেই তাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। যদি তা-ই হয়, তবে ওই একই সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত দলের যেসব অন্য নেতাদের দেখা গেল, তাদের বিষয়টি কী? কারণ, তাদের নিশ্চয়ই সুরক্ষা দিয়ে সে দেশে নিয়ে যাওয়া হয়নি।

রাজনীতি পাশে সরিয়ে রাখলেও বাণিজ্য, সাধারণ পর্যটন এবং চিকিৎসাজনিত যাতায়াতের জন্য দুই দেশেরই এই সম্পর্কের উন্নতি প্রয়োজন। যখন সম্পর্ক উত্তপ্ত, তখন দুই দেশই একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারে—দুই দেশের সাধারণ মানুষকে তাদের মত জানাতে দেওয়া উচিত যে কীভাবে এই অমিল দূর করা যায়।

প্রতিটি সম্পর্কের মধ্য দিয়েই খারাপ সময় যায়; এর আগেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। অতীতে চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে এই সম্পর্ক এতটা উত্তপ্ত হয়েছিল যে দুই সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছিল। আশার কথা হলো, আমরা এখন অনেক বেশি সচেতন ও বাস্তববাদী যুগে বাস করছি, তাই শুভবুদ্ধি ও যুক্তিরই জয় হওয়া উচিত।

কঠিন সময় পেরিয়েই সম্পর্ক মজবুত হয়, যখন উভয় পক্ষ আলোচনা করতে চায় এবং দৃশ্যমান ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়। আশা করা যায়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাবেন এবং আমরা একটি সফল আলোচনার অপেক্ষায় আছি–তবে তা পরিস্থিতি আরেকটু শান্ত হলে এবং তাড়াহুড়ো না করে ধীরে-সুস্থে হওয়াই শ্রেয়।

প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব অত্যন্ত মূল্যবান। তবে সত্যিকারের বন্ধুত্ব তখনই তৈরি হয়, যখন দুই পক্ষই নিজের কথা স্পষ্ট করে বলতে পারে–কোনো এক পক্ষ শুধু আদেশ দেবে আর অন্য পক্ষ তা চুপচাপ মেনে নেবে, তা বন্ধুত্ব হতে পারে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad