বিচারকের সংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকায় চরম মামলাজটের মুখে পড়েছে সর্বোচ্চ আদালত। বর্তমানে সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে প্রায় ৩৯ হাজার মামলা। অথচ বিচারক মাত্র চারজন।
এই সংকট কাটাতে নতুন বিচারক নিয়োগের আলোচনা জোরদার হলেও, সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীর অতীত রেকর্ড, বিচারিক সিদ্ধান্ত ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া এখন বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ও জনগণের আস্থার এক বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাবেক বিচারক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমস্যাটি এখন আর শুধু শূন্যপদ পূরণের নয়। মূল চ্যালেঞ্জ হলো এমনভাবে বিচারকসংখ্যা বাড়ানো, যাতে আদালতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়।
বর্তমানে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগে মোট চারজন বিচারক রয়েছেন। অন্য তিনজন হলেন—বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
গত ১৫ জুলাই বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম এবং এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান অবসরে যাওয়ার পর আপিল বিভাগের বেঞ্চসংখ্যা কমে যায়। বিচারক সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা গেছে; গত ২৩ জুলাই মাত্র দুজন বিচারককে নিয়ে একটি বেঞ্চ গঠন করতে হয়েছিল, যার ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি সম্ভব হয়নি।
সংবিধানে বা কোনো আইনে আপিল বিভাগের বিচারকসংখ্যা নির্দিষ্ট করা না থাকলেও অতীতে এখানে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারক দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ১১ জন বিচারকের কাছে বিচারাধীন মামলা ছিল ৫ হাজার ২৬০টি। ২০২৪ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ হাজারে, অর্থাৎ গত ১৫ বছরে মামলাজট বেড়েছে প্রায় আট গুণ।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী জানান, এত বিশাল মামলার চাপ একটি মাত্র বেঞ্চের পক্ষে সামাল দেওয়া অসম্ভব। দ্রুত বিচারক নিয়োগ না দিলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমবে না। আগে তিনটি বেঞ্চ চালু থাকায় দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হতো, কিন্তু বিচারকের অভাবে এখন সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন বিচারক নিয়োগের তোড়জোড় চলছে, যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক। আলোচনায় থাকা প্রার্থীর তালিকায় চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এবং গত জুলাই আন্দোলনের পর পদত্যাগ করা হাইকোর্টের এক সাবেক বিচারক রয়েছেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে দক্ষ হলেও তার অতীত কিছু সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এ ছাড়া বিতর্কিতভাবে পদত্যাগ করা কোনো বিচারককে আবার আপিল বিভাগে ফিরিয়ে আনা বিচার বিভাগের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
তা ছাড়া শেখ হাসিনার সরকারের শেষ দুই মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া হাইকোর্টের আরও কয়েকজন বিচারকের নামও বিবেচনায় আছে। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আইনজীবীদের বক্তব্য, কেবল জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়; বরং সততা, বিচারিক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে বিচারক নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড করা উচিত। বর্তমানে হাইকোর্টে সর্বজনীন আস্থা রয়েছে এমন বিচারকের সংখ্যা খুবই কম।
তা ছাড়া সংবিধানে কেবল হাইকোর্টের কর্মরত বিচারকদের মধ্য থেকেই আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্য থেকেও সরাসরি বিচারক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন মনে করেন, বিতর্ক এড়াতে এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে অবিলম্বে একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর অধীনে বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।


