নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগ, সিরাজগঞ্জের খাদ্য নিয়ন্ত্রক লাপাত্তা

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগ, সিরাজগঞ্জের খাদ্য নিয়ন্ত্রক লাপাত্তা
সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে সম্প্রতি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে। এরপরই তিনি নিজ কর্মস্থল ছেড়ে আত্নগোপনে চলে গেছেন।

বৃহস্পতিবার, শনিবার, রোববার ও সোমবার টানা চারদিন বেলা পৌনে ১২ টার দিকে সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের হোসেনপুর দক্ষিণ এলাকায় অবস্থিত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দপ্তরের অন্য কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ গত বুধবার সবশেষ অফিসে এসেছিলেন। এরপর দপ্তরিক প্রয়োজনে তার মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

খাদ্য বিভাগ সূত্র জানা গেছে, হারুন অর রশিদ গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা ও ৩৬তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) কর্মকর্তা। তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ২৭ আগস্ট সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে যোগ দেন। এর আগে বিভিন্ন জেলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এই দায়িত্বের আড়ালে অন্তত ১১টি সরকারি দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে তার সক্রিয়তা সম্পর্কে ওই কর্মকর্তারা অজ্ঞাত ছিলেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন তিন লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ওইদিন ঢাকা মহানগরের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পরীক্ষা শুরুর ২-৩ মিনিটের মাথায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় পরদিন ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলার নথিপত্র ১৮ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে।

সেই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটি এখনও প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে গত শুক্রবার নতুন করে এই নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে মাঠে নামে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে বেরিয়ে এসেছে খাদ্য কর্মকর্তা হারুনসহ প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কের তথ্য। এরইমধ্যে ওই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

আরও পড়ুন

এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে ওই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই প্রশ্ন ফাঁস নেটওয়ার্কের বিস্তার শুধু একটি দপ্তর বা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই সিন্ডিকেট। এতে কেউ কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী, কেউ আছেন প্রশ্ন ও পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে, আবার কেউ এক স্তর থেকে আরেক স্তরে প্রশ্ন পৌঁছে দেন। কেউ কাজ করেন পরীক্ষার্থী সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের যোগাযোগে। সব মিলিয়ে প্রশ্নফাঁসের একটি বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক।

প্রশ্ন ফাঁসকাণ্ডে সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ওই সাতজনের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সটিং পর্যালোচনা করে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, হিসাব সহকারী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, উপ খাদ্য পরিদর্শক, খাদ্য মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, অডিটর, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ), পরিবেশ অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা, রাজশাহী পোস্টাল অপারেটর এবং মেইল অপারেটর নিয়োগ পরীক্ষা।

সূত্রটি আরও জানায়, নেটওয়ার্কটির কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপ। পুরো কার্যক্রমে মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন তিনি। গা ঢাকা দেওয়ায় সুজিত গোপকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে হেফাজতে নেওয়া গেলে এই কাজে তাকে উপর মহলের আর কেউ সহযোগিতা করছে কি না, সেই তথ্য পাওয়া যাবে।

জানা গেছে, সুজিত গোপের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে কাজ করেন কয়েকজন সহযোগী। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী আসাদুল হাবিব, একটি ট্যাক্স ফার্মের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিম্নমান সহকারী বা পেশকার জাহাঙ্গীর আলম ও চক্রের সদস্য এস এম এমদাদুল রহমান। তাদের দায়িত্ব নেটওয়ার্কের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশ্ন ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। এমদাদুলের দায়িত্ব মতিঝিল এলাকার। এই এলাকায় যেসব পরীক্ষার্থীর পরীক্ষার সিট পড়ত তাদেরকে গোপন বুথে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করাতেন এমদাদুল। তার গোপন বুথ ছিল মতিঝিল এলাকায়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষায় মতিঝিলের বুথে এমদাদুল এবার ১৫ জনকে প্রশ্ন পড়িয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর তার থেকে প্রশ্ন যেত মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফি ও হাসিনুর রহমান সুজন নামের দুজনের কাছে। মফিজুলের কাছ থেকে প্রশ্ন যেত পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোহাম্মদ রুবেল ইসলামের কাছে। এদের সাতজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চক্রের রুবেল ইসলাম এক সময় কম্পিউটারের দোকানদার ছিলেন। ২০২০ সালের দিকে প্রযুক্তির সেই ব্যবসায় অনলাইনে ফরম পূরণ, ডাউনলোডিং, প্রিন্টিং, টাইপিং করতে গিয়ে প্রশ্নফাঁস চক্রে জড়িয়ে পড়েন। প্রশ্নফাঁস চক্রের এরপরের ধাপের কাউকেই এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওপরের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের খবরে তারা গা ঢাকা দিয়েছেন।

চক্রটির শেষ লেয়ারে কাজ করতেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকির। তার কাছ থেকে প্রশ্ন যেত সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদের হাতে। এই ধাপে হারুন ছাড়াও কাজ করতেন আরও অন্তত তিনজন। তবে হারুন-সোহাগ সিন্ডিকেট ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। হারুন ও সোহাগ দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার সময় থেকেই তাদের মধ্যে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। অন্য তিন কর্মকর্তা হলেন- বিসিএসআইআরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক রাফিউল ইসলাম ও ভারতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরি প্রসাদ রায়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর সেটির উত্তর তৈরি করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে তাদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায় উত্তরপত্র।

এর বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে ১০ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করতেন। পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত চাকরিপ্রার্থীদের মূল শিক্ষাসনদসহ তাদের হেফাজতে রাখা হতো। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চক্রকে পুরো টাকা দেওয়ার পরই সনদ ফেরত পেতেন প্রার্থীরা। যারা একসঙ্গে আগাম টাকা দিতে পারতেন না, তাদের কাছ থেকে সই করা ব্যাংকের চেকের পাতা নেওয়া হতো। এসব চেকের প্রতিটির বিপরীতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে লেখা থাকত।

তবে, অভিযুক্ত সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ক্ষুদেবার্তা দিয়েও কোন সাড়া মেলেনি। এরপর তার অফিসে গেলে জানা যায়, চাকরির প্রশ্নফাঁস নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠায় তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad