টুপটুপে আগুন/ মামলায় নাম নেই আরেক মালিকের, অভিযোগপত্র সংশোধনের আশ্বাস

মামলায় নাম নেই আরেক মালিকের, অভিযোগপত্র সংশোধনের আশ্বাস
টুপটুপ রেস্তো এন্ড রিসোর্টের দুই মালিক এবং ম্যানেজার (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেকে ‘টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে’ আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় এক মালিককে আসামি করা হলেও অপর মালিকের নাম নেই। এমনকি মামলার এজহারে ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতামূলক নোটিশের বিষয়টিও উল্লেখ নেই। এতে অবহেলাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় নির্ধারিত ধারায় করা মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে রিসোর্টটিতে আগুনে ১০ প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হন ছয়জন। এ ঘটনায় এখনো ১১জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের যৌথ মালিকানায় গড়ে ওঠে টুপটুপ রিসোর্ট। গত ১৭ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলাটি করেন। এতে রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াসহ চারজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। পাশাপাশি রিসোর্টের ১৯ কর্মচারীকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

এজাহারভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন- রিসোর্টের প্রধান ব্যবস্থাপক বরিশালের সাঈদ আহাম্মেদ (৩২), ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ (৩০) এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন (২৯)। তবে যৌথ মালিকানার আরেক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদের নাম এজাহারে উল্লেখ নেই।

আগুনের ঘটনার পর করা মামলার এজাহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আইনজীবীদের মতামত বিশ্লেষণে মালিকানা, দায় নির্ধারণ এবং তদন্তের প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। আইনজীবীদের কেউ কেউ মামলাটিকে দায়সারা ও দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। তবে পুলিশ বলছে, মামলার এজাহারে কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে তা তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে যুক্ত করা হবে।

দুই মালিকের একজন বাদ, প্রশ্ন তদন্তের শুরুতেই

কক্সবাজার আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টটি যৌথ মালিকানার, সেটি সবাই জানে। কিন্তু একজনকে আসামি করা এবং অন্যজনকে বাদ দেওয়া রহস্যজনক। এ ছাড়া নিরীহ কর্মচারীদের অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।’

‘একটি অগ্নিকাণ্ডে এ ধরনের দায়সারা মামলা পুলিশের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা’ বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে নিয়াজ মোর্শেদকে শুরুতেই আসামি না করার পেছনে তার নাম জানা না থাকাকে কারণ দেখিয়েছে পুলিশ।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘মামলাটি যখন হয়, তখন পুলিশ নিয়াজ মোর্শেদের নাম জানত না। এ কারণে এজাহারে আপাতত তাঁর নাম নেই। তবে এই মামলায় তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, এটা নিশ্চিত।’

আরও পড়ুন

তদন্তের শুরুতে একজন অংশীদারের নাম না থাকা এবং পরে তাকে কী প্রক্রিয়ায় মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে এখন নজর রয়েছে তদন্তের অগ্রগতির দিকে।

ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ বিষয় এজাহারে উল্লেখ নেই

অগ্নিকাণ্ডের আগে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে ফায়ার সার্ভিস সতর্ক করে নোটিশ দিয়েছিল বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত জুনে দেওয়া ওই নোটিশের বিষয়টি মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে রিসোর্ট পরিচালনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মামলার বাদী উপপরিদর্শক আশিস সূত্রধরের কাছে ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ এবং রিসোর্টের অপর মালিককে আসামি না করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি পূজার ছুটিতে আছি। পূজা শেষে আগামী ২৭-২৮ অক্টোবর ফিরব। এরপর আপনি থানায় আসেন, তারপর কথা হবে।’

আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, ‘গণমাধ্যমের মাধ্যমে ঘটনার দিন থেকেই দেশবাসী জানতে পারে, গত জুন মাসে ফায়ার সার্ভিস রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে নোটিশ দেয়। কিন্তু পুলিশ এই কথাটি এজাহারে উল্লেখ না করায় মামলাটি দুর্বল হয়ে গেছে।’

তার মতে, মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০৪-ক ধারায় করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি এজাহারে উল্লেখ করা হলে আরও কঠোর ধারায় অভিযোগ আনার সুযোগ তৈরি হতে পারত। তিনি জানান, সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন এবং সর্বনিম্ন ১০ বছর কারাদণ্ড হতে পারত।

তবে কোন ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হতে পারে, তা নির্ভর করবে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব, অবহেলার ধরন ও প্রমাণের ওপর। শুধু নোটিশের অস্তিত্বের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি প্রযোজ্য হয় না।

অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, ‘এই রিসোর্টে আগুন লাগা, মানুষের মৃত্যু প্রমাণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অবহেলার বিষয়। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভবন হয় কী করে, ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠান এত দিন চলল কী করে?’

তার বক্তব্যে রিসোর্টটির নির্মাণ অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তার কী কী ব্যবস্থা ছিল এবং কোন দপ্তর কী দায়িত্ব পালন করেছে, তা নথিপত্র যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

কক্সবাজার আইন কলেজের প্রভাষক সেজান এহেছান বলেন, ‘পুলিশ মামলাটি নিয়ে নয়ছয় করেছে, এটা পরিষ্কার। ওই মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই, এমন কর্মচারীদেরও আসামি করা হয়েছে। যে ধারায় পুলিশ মামলা করেছে, সেটি জামিনযোগ্য।’

মামলায় দায় নির্ধারণ ও অপরাধের ধারা প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে তার বক্তব্যেও প্রশ্ন উঠে এসেছে। তবে কোনো আসামি জামিন পেতে পারেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

অভিযোগপত্রে সংশোধনের আশ্বাস পুলিশের

মামলার এজাহারে কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে তদন্ত শেষে তা সংশোধনের কথা জানিয়েছে পুলিশ। উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘এটি কেবল এজহার। এখানে যদি কোনো ভুল থাকে, অসংগতি থাকে, তা অভিযোগপত্রে সংযোজন করা হবে।’

তবে যৌথ মালিকানার অপর অংশীদারকে আসামি করার বিষয়ে পুলিশের আশ্বাসের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ, রিসোর্টের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং অগ্নিকাণ্ডের জন্য কার কী দায় ছিল—এসব বিষয় তদন্তে কীভাবে যাচাই করা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রেপ্তার সুমনের সাত দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ

এদিকে মামলার চার নম্বর আসামি ও রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদ হোসেন সুমনকে গত রোববার আদালতে পাঠিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। তবে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে উপস্থিত না থাকায় রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয়নি।

ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘রোববার বিকালে সুমনকে আদালতে তোলা হয়। কিন্তু এই মামলার কাজে ডিএনএর নমুনা নিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকায় ছিলেন। তাই রিমান্ড শুনানি হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা মঙ্গলবার আসবেন। তিনি এলে শুনানি হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad