ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স), আসামিদের আপিল এবং জেল আপিলের ওপর হাইকোর্টে আজ সোমবার রায় ঘোষণা করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে। এর আগে গত ২৮ জুলাই প্রথম দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। হাইকোর্ট একই সঙ্গে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের প্রশ্ন, দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিল এবং জেল আপিলের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ এজাজ কবির ও ইমাম হোসেন তারেক। আসামিপক্ষে ছিলেন এসএম শাহজাহান ও মোহাম্মদ শিশির মনির।
১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায় দেয়। রায়ে মামলার ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
একই বছরের ২৯ অক্টোবর নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়াটি ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। পরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল দায়ের করেন।
পরবর্তী সময়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক, অর্থাৎ বিচারিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র মুদ্রণের কাজ সম্পন্ন হয়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হয়। পরে প্রধান বিচারপতি শুনানির জন্য বর্তমান হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করেন।
যে অভিযোগ থেকে শুরু
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ–দৌলা তার অফিসে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। পরদিন ২৭ মার্চ নুসরাতের মা শিরিন আক্তার সোনাগাজী মডেল থানায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ–দৌলাকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ সেদিনই তাকে গ্রেপ্তার করে।
কিন্তু মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়নি। অভিযোগপত্রে বলা হয়, শ্লীলতাহানির মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার অনুগতরা ক্ষিপ্ত হন।
এর কয়েক দিন পর ৬ এপ্রিল নুসরাতকে মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বোরকা পরা পাঁচ দুর্বৃত্ত তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।
১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।
হত্যাচেষ্টা মামলা থেকে হত্যা মামলা
অগ্নিদগ্ধ করার ঘটনার পর নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম উল্লেখসহ কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে সোনাগাজী থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
পুলিশ তদন্ত শেষে এজহারভুক্ত আট আসামির সঙ্গে আরও আটজনকে যুক্ত করে মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। অভিযুক্ত ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।


