স্বৈরাচারী ক্ষমতার নীরব স্বাভাবিকীকরণ

স্বৈরাচারী ক্ষমতার নীরব স্বাভাবিকীকরণ
আসিফ বিন আলী। ইলাস্ট্রেশন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন গত কয়েক সপ্তাহের বেশ কিছু ঘটনা সংবাদের শিরোনামে এসেছে। ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে আলাদা হলেও এদের একসঙ্গে রেখে দেখলে একটি নির্দিষ্ট ধরন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর সেই বিষয়টিই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। পাসপোর্ট, টিকিট ও আনুষঙ্গিক সব কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও প্রাপ্তবয়স্ক তিন নারীকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি। কারণটা কী? তারা অবিবাহিত ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে কোনো পুরুষ অভিভাবক  ছিলেন না। সেখানকার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেন, এই অবস্থায় তাদের বিদেশে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এখানে প্রশ্নটা খুব সহজ–একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিদেশে যেতে পারবেন কি না, তা কি দেশের আইন ঠিক করবে, নাকি বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নীতি-নৈতিকতার বিচারে ঠিক হবে?

অবিবাহিত কোনো নারী একা ভ্রমণ করবেন না–একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে এমনটা বিশ্বাস করতেই পারেন। কিন্তু সরকারি চেয়ারে বসে তার ব্যক্তিগত পছন্দ- অপছন্দের কোনো সুযোগ নেই। সেখানে দেখার বিষয় কেবল একটাই–আইন কী বলে। কিন্তু এই ঘটনায় দেখা গেল, আইন থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা নিজেদের পছন্দকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

ঢাকার মেট্রোরেলের ঘটনাটিও একই কথা মনে করিয়ে দেয়। হাফপ্যান্ট পরে ট্রেনে ওঠার কারণে এক খেলোয়াড়ের পথ আটকান পুলিশ সদস্য। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ওই কর্মকর্তা বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ওই খেলোয়াড়কে বলছেন তার পোশাক  ‘অশালীন’। অথচ মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট পরা যাবে না–এমন কোনো নিয়ম কোথাও নেই। পরে অবশ্য পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ওই পুলিশ সদস্য মনে করেছিলেন কোনো নাগরিক কী পোশাক পরবেন, তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার তার রয়েছে। প্রশ্ন তো একটাই–কোনটা শালীন আর কোনটা অশালীন, তা কে ঠিক করবে? আইন, নাকি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ অফিসার?

এরপর আসে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনা। রাজধানীর একটি হাসপাতালে হুট করে একশর বেশি মানুষ ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাণ্ডব চালাল। মালামাল লুট করা হলো, এমনকি ভাঙচুরের জন্য এক্সকাভেটর পর্যন্ত নিয়ে আসা হলো। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসে, স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন এই ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন। পরবর্তীকালে পুলিশ মামলা নেয়, চোরাই জিনিস উদ্ধার করে এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়। এমনকি নিজ দলের এক সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যকেও পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে মূল প্রশ্নটি কিন্তু থেকেই যায়–রাজধানীর বুকে শতাধিক মানুষ জমায়েত হয়ে এক্সকাভেটর নিয়ে একটি হাসপাতালে তাণ্ডব চালাল, আর রাষ্ট্র সময়মতো তা টের পেল না কেন?

একটি ভবনে ভাঙচুর চালাতে কয়েক মিনিট লাগে না ঠিকই, তবে শত শত লোক জড়ো করা  আর ভারী যন্ত্রপাতি আনার জন্য আগেভাগে প্রস্তুতির বিষয় থাকে। সব ঘটে যাওয়ার পর কেবল ‘কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে’ বললে পুরো জবাব পাওয়া যায় না। তাও ভালো যে, সরকার নিজ দলের সংসদ সদস্যকে কোনো ছাড় দেয়নি।

অন্যদিকে, চরম ডানপন্থী কর্মী আতাউর রহমান বিক্রমপুরী নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, তার প্রথম বিয়ের সময় স্ত্রীর বয়স ছিল ১৩ বছরের কম। বিয়ের দেড় বছরের মধ্যেই তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। আরেক লেখায় তিনি ১৪ বছরের মেয়ের বিয়েকে সমর্থন দিয়েছেন। আমাদের দেশে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন আইনি বয়স ১৮ বছর। দেশের আইন ভেঙে সেই কথা আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গর্ব করে প্রচার করার পর কোনো সরকারি সংস্থা কি তার কাছে কৈফিয়ত চাইবে না? এটি তো সরাসরি নারী ও শিশুর সুরক্ষার আইনি অধিকারের বিষয়।

আমরা প্রায়ই ধর্মীয় বিশ্বাস আর দেশের আইনকে এক করে ফেলি। যে কেউ ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিংবা আইন পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারেন; সেই অধিকার সবার আছে। কিন্তু যতক্ষণ আইন কার্যকর আছে, ততক্ষণ ‘আমার ধর্মীয় মতামত আলাদা’ বলে আইন অমান্য করা যায় না, কিংবা আইন ভেঙে বড়াইও করা যায় না। তা না হলে আইনের শাসনের আর মূল্য কী রইল?

সবশেষ ঘটনাটি ঘটে ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল-এর বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে। দুই তরুণ দোকানে ঢুকে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি দেখতে চান। বই বের করে দেওয়ার পর তারা দাবি করেন, বইটি নাকি নিষিদ্ধ। এটি কেন বিক্রি করা হচ্ছে, তা নিয়ে তারা গোলমাল শুরু করেন। প্রকৃতপক্ষে বইটি নিষিদ্ধ নয়। ধীরে ধীরে আরও লোক জমে যায় এবং দোকানের শাটার নামিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ এসে উল্টো ইউপিএল-এর দুই কর্মীকে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। অথচ যারা জোর করে দোকান বন্ধ করল, তাদের কিছুই করা হলো না।

আরও পড়ুন

ঘটনাটি আরও অদ্ভুত রূপ নেয় যখন সূত্রাপুর থানার ওসি এক সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘আর কোনো দিন এই বই বিক্রি করা হবে না’–এমন শর্তে নাকি দোকানের কর্মীদের ছাড়া হয়েছে।  একজন পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে বই বিক্রির ওপর এমন শর্ত দিতে পারেন? কোনো বই নিষিদ্ধ করার অধিকার কি ওসির আছে?

যে দুই তরুণ এসে এই ঝামেলা তৈরি করল, তাদের নাম-পরিচয় এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। পুলিশ যদি তাদের চিনে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে–সেই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।

এখানে বর্ণনা করার প্রতিটি ঘটনাকে একসঙ্গে মেলালে দুটি বড় প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

প্রথমত, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রায়ই দেশের আইনকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের ব্যক্তিগত মনগড়া নৈতিকতা চাপিয়ে দিচ্ছেন এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছেন। বিমানবন্দরে কর্মকর্তা ঠিক করছেন নারী একা যাবেন কি না, মেট্রোরেলে পুলিশ ঠিক করছে পুরুষের পোশাক কেমন হবে, আর থানায় বসে ওসি ঠিক করছেন কোন বই বিক্রি করা যাবে।

এগুলো কোনো সাধারণ ভুল নয়। সাধারণ মানুষ আপনাকে বলতে পারে যে আপনার পোশাক পছন্দ হচ্ছে না। আপনি সে কথা গায়ে না মেখে চলেও যেতে পারেন। কিন্তু পুলিশ বা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা যখন একই কথা বলেন, তখন তাদের পেছনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকে। তাদের কথা না শুনলে আপনার বিদেশযাত্রা কিংবা গন্তব্যে পৌঁছানো আটকে যেতে পারে। এই ক্ষমতার পার্থক্যের গভীরতা কি আমরা বুঝতে পারছি?

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবশালী বা তাদের সমর্থকরা যেভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন, তা উদ্বেগজনক। মিরপুরের ঘটনায় যেমন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের নাম এসেছে, ইউপিএল-এর ঘটনাতেও পুলিশ জানিয়েছে ঝামেলার পেছনে স্থানীয় বিএনপির লোকজন ছিল। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মীরা যখন নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে হাসপাতাল বা দোকানে হামলা চালায়, সমস্যাটা সেখানেই।

কোনো কর্মীর মাথায় কী ঘুরছে, তা দলের শীর্ষ নেতাদের পক্ষে সবসময় জানা সম্ভব নয়। কিন্তু সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে–রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইন হাতে তুলে নিলে রক্ষা নেই। সেই বার্তাটি কি ঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে?

মিরপুরের ঘটনায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা ভালো। কিন্তু ঘটনা ঘটার আগে কেন তা আটকানো গেল না? আবার ইউপিএল-এর ঘটনায় তো অপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে উল্টো বিক্রেতাকে শর্ত দেওয়া হলো। সরকারের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ধীরগতির পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

ক্ষমতা কেবল ওপরের আদেশে চলে না, তা চলে নানা সংকেতের মাধ্যমে। একজন কর্মী যখন দেখেন দোকানে তালা দিয়েও পার পাওয়া যায়, তখন তিনি সেই সংকেতটিই পান। একজন কর্মকর্তা যখন দেখেন নিজের ইচ্ছামতো নাগরিকের অধিকার আটকে দেওয়া যায়, তিনিও সেই বার্তা পান। এভাবে চলতে থাকলে বেআইনি অভ্যাসগুলোই একদিন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।

সরকার কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থেকেছে। এই নিষ্ক্রিয়তা অবহেলা নাকি অনিচ্ছা, তা তর্কসাপেক্ষ। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার: রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস বা প্রশাসনিক ক্ষমতা যাই থাকুক না কেন, তা আইনের চেয়ে বড় হতে পারে না–এই স্পষ্ট বার্তাটি দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

আইনের শাসন বজায় রাখতে হলে আইনকে সবার ওপরে রাখতে হবে। রাষ্ট্র যদি এতে ব্যর্থ হয়, তবে সমাজে একটাই নিয়ম চালু হবে–‘জোর যার মুল্লুক তার’।

সবশেষে সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো দেখে একটাই প্রশ্ন মনে জাগে: বাংলাদেশে শেষ কথা কে বলবে–দেশের আইন, নাকি যার হাতে যখন ক্ষমতা থাকে সে?

  • আসিফ বিন আলী ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।
Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad