নিজেই রোগাক্রান্ত শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

নিজেই রোগাক্রান্ত শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
বাগেরহাটের শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফাটল ধরা দেয়াল ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ভবনের দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা, আর ছাদ চুইয়ে ঝরছে পানি। ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে এক বছর আগেই ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বিকল্প কোনো জায়গা না থাকায় এই বিপজ্জনক ভবনেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে চিকিৎসা।

বাগেরহাটের উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলার ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি শুধু জরাজীর্ণ ভবনের সমস্যাতেই আটকে নেই, ঘিরে ধরেছে আরও নানান সংকট। চারপাশ নোংরা-আবর্জনায় ভরা, আর শৌচাগারের উৎকট দুর্গন্ধে ওয়ার্ডে টেকাই দায়। রোগী ও স্বজনদের পক্ষে একটু শান্তিতে নিশ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ডাক্তার ও কর্মীর অভাবে একপ্রকার ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘ আট বছর ধরে বন্ধ অপারেশন থিয়েটার, দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে রুমে তালা ঝুলছে, আর জ্বালানি তেল নেই বলে অলসভাবে ফেলে রাখা হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকার শক্তিশালী একটি জেনারেটর।

সহজ কথায়, হাসপাতালটি নিজেই এখন রোগাক্রান্ত। এর ফলে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে উপকূলের প্রায় দেড় লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা। অস্ত্রোপচার, সিজার কিংবা সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা না থাকায় স্থানীয়রা হাতের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে অনেককে শহরের প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের আরও চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র মিলিয়ে মোট ৩৯ জন ডাক্তারের পদ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ১১ জন।

পুরো শরণখোলায় কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এমনকি গর্ভবতী নারী বা শিশুদের দেখার মতো কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তারও পাওয়া যায় না। ফলে জরুরি ও জটিল সমস্যায় চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নার্সের ৩০টি পদের বিপরীতে আছেন ২২ জন। আর পাঁচজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জায়গায় কাজ চালাচ্ছেন মাত্র একজন। সব মিলিয়ে চিকিৎসক ও কর্মচারী মিলে ১৭১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৬ জন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এত কম লোকবল নিয়ে বিশাল এলাকার এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সার্জারি ডাক্তারের অভাবে ২০১৮ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটার। এতদিন ধরে ব্যবহার না করায় কোটি টাকার সব মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশন কিংবা ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের জন্যও রোগীদের বাইরে যেতে হয়।

আরও পড়ুন

এই অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে দরিদ্র মানুষ। বাধ্য হয়ে চড়া দামে প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে তাদের। অনেকে আবার উপায় না পেয়ে বাগেরহাট বা খুলনার হাসপাতালে ছুটছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অপারেশন থিয়েটার ও এক্স-রে ঘরের কাচের দরজায় তালা ঝুলছে। ভেতরের দামি সব চিকিৎসা সরঞ্জাম ধুলোবালি জমে নষ্ট হচ্ছে।

ছাদ, দেয়াল ও বিমে স্পষ্ট বড় বড় ফাটল। পলেস্তারা খসে বেরিয়ে এসেছে জং ধরা রড। ছাদ গলে পানি পড়ায় মেঝেতে বসিয়ে রাখা হয়েছে বালতি ও গামলা। জরুরি বিভাগে মাথার ওপর থেকে পলেস্তারা খসে পড়লেও তার নিচেই চালু রাখা হয়েছে সিলিং ফ্যান।

এমন জীবনঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন।

হাসপাতালে ভর্তি রোগী ফরিদা বেগম, মায়া বেগম ও সবুজ মিয়া টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, মাথার ওপর ফাটল ধরা ছাদ দেখে সারাক্ষণ তারা ছাদ ধসে পড়ার আতঙ্কে থাকেন। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে তাদের বিছানা-বালিশ ভিজে যায়।

তাদের ক্ষোভ, শৌচাগারগুলো এতই নোংরা যে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ওয়ার্ডে। তাদের মতে, এখানে সুস্থ হতে এসে মানুষ উল্টো আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তবুও বাধ্য হয়েই তাদের এখানে থাকতে হচ্ছে।

জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোর্শেদা আক্তার সুমি টাইমসকে জানান, সিলিং থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার পর তারা বাধ্য হয়ে জরুরি বিভাগের অন্য কোণে বসে রোগী দেখছেন। কিন্তু এখন সেই জায়গার ছাদেও ফাটল ধরেছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন কয়েকশ রোগী জরুরি বিভাগে আসেন। আমরাও বাধ্য হয়ে জীবনঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’

শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রিয় গোপাল বিশ্বাস জানান, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এই ভবন ব্যবহার করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই।

তিনি আরও জানান, একটি অস্থায়ী টিনশেড তৈরির প্রস্তাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো সেটির কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ভবনের করুণ অবস্থার পাশাপাশি ডাক্তারসহ জনবল সংকট স্বাস্থ্যসেবাকে আরও পঙ্গু করে দিয়েছে বলে জানান তিনি। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী। বেড না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে মেঝে ও বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘এত কম ডাক্তার আর শয্যা দিয়ে এত বড় এলাকার মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। ওপরের মহল থেকে দ্রুত সমাধান না করা হলে আমাদের সত্যিই কিছু করার নেই।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad