মাসের নির্দিষ্ট দিনে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার সারতা সারাশন বাজারে বসে মানবিক সেবার আয়োজন। সকাল থেকেই সেখানে ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ আসেন বিনামূল্যে চিকিৎসা নিতে। কেউ পরামর্শ চান চিকিৎসকের। আবার কেউ পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা জানাতে আসেন। মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন নিয়েও অনেকে সহযোগিতা চান।
সাধারণ একটি বাজারে ওই দিন তৈরি হয় ব্যতিক্রমী পরিবেশ। অসহায় মানুষের প্রত্যাশা আর সেবাদানকারীদের ব্যস্ততায় ফুটে ওঠে মানবিকতার চিত্র। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া হয় আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা।
এই উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন চিকিৎসক এস এম রাহিদুজ্জামান রানা। তিনি ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের চিকিৎসক। নিজের এলাকার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত মানবিক চিকিৎসক হিসেবে।
প্রায় দেড় বছর ধরে মহাদেবপুরের অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও বিভিন্ন মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছেন তিনি।
দাদা-দাদির স্মৃতি ধরে রাখতে তাদের নামে কাশেম আলী সরদার-জয়নুর বিবি বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন রানা। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই শুরু হয় সেবামূলক কার্যক্রম।
৬০ জনের বেশি সদস্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ফাউন্ডেশনটি। ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের পাশাপাশি অসচ্ছল পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, মেধাবীদের উৎসাহ, মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি।
ফাউন্ডেশনের মূলমন্ত্র, ‘মানুষের পাশে, মানবতার বিকাশে, সৃষ্টির সেবায়, স্রষ্টার সন্তুষ্টি।’
মাসের নির্দিষ্ট দিনে এলাকায় মাইকিং করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার কথা জানানো হয়। খবর পেয়ে দূর-দূরান্ত থেকেও অসহায় মানুষ সেবাকেন্দ্রে আসেন।
সম্প্রতি সারতা সারাশন বাজারে ফাউন্ডেশনের একটি কার্যক্রমে দেখা যায়, সকাল থেকেই মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ চিকিৎসকের কাছে অসুস্থতার কথা বলছেন। কেউ চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার কেউ পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা জানাচ্ছেন।
মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার ধরনও নির্ধারণ করা হয়। আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারকে অর্থ দেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে দেওয়া হয় খাদ্য সহায়তা। ফলে চিকিৎসা ক্যাম্পটি স্থানীয় মানুষের নানা সমস্যার কথা জানানোর জায়গা হিসেবেও কাজ করছে।
সারতা গ্রামের ইতি আরা বেগমের পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে অভাব। তার স্বামী ও সন্তান দিনমজুর। মেয়ের বিয়ের বয়স হলেও অর্থের অভাবে বিয়ে দিতে পারছেন না। এই দুশ্চিন্তা নিয়ে তিনি চিকিৎসক রানার কাছে এসেছিলেন।
ইতি আরা বলেন, ‘তিনি আমাদের যথেষ্ট আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন।’
সারতা পশ্চিম পাড়ার অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে এলাকায় মাইকিং করে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। তিনি খুবই যত্নসহকারে সেবা দিয়ে থাকেন।’
ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেড় বছরে প্রান্তিক পর্যায়ের ১ হাজার ৫৭ জন মানুষ চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন।
চিকিৎসক রানা টাইমস বলেন, ‘এলাকার মানুষ শুধু নয়, আরও বড় পরিসরে এসব সেবামূলক কার্যক্রম সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি ও আমার স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল আমরা। সেটা দিয়ে মানুষের পাশে থাকতে চাই।’
মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মানজুরা মুশাররফ বলেন, ‘তার এমন উদ্যোগ অনেকের জন্য অনুকরণীয় হবে বলে আশা করছি। যদি কখনও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, তবে অবশ্যই আমরা তা করব।’


