পদ্মাসেতুর পর প্রথমবারের মতো রেল লাইন স্থাপন হয় মাদারীপুরের শিবচরে। ঢাকা থেকে ট্রেনে চড়ে সহজেই মাদারীপুরের শিবচর হয়ে রাজশাহী, খুলনা পর্যন্ত যাওয়া যায়। রেললাইন স্থাপনের পর থেকে এই এলাকার মানুষের অবসর সময়ে ঘুরে বেড়ানোর নতুন এক জায়গা তৈরি হয়েছে। বাড়ির কাছের এই রেল লাইনে বিকাল হলেই ঢুঁ মেরে আসেন স্থানীয়রা। আবার বিকাল বেলা ঘুরতে বের হয়েই দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদেরও রেল লাইনে বিচরণ করতে দেখা যায়। তবে রেল চালু হওয়ার পর অযাচিত এই ঘুরাঘুরি প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিবচরে রেল লাইনে ঘুরতে এসে, সেলফি তুলতে গিয়ে একাধিক প্রাণহাণি এবং আহতের ঘটনাও ঘটেছে। এরপরও ঝুঁকি জেনেও রেল লাইন এবং স্টেশনে কমছে না ভ্রমণপ্রেমীদের আড্ডা।
জানা গেছে, পদ্মাসেতুর জাজিরা পয়েন্ট থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল পথের দূরত্ব ৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে শিবচরের পদ্মা ও শিবচর স্টেশন রয়েছে। এই রুটে ২০২৩ সালের অক্টোবরে পদ্মাসেতু হয়ে আংশিক ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পুরোপুরিভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ঢাকার কমলাপুর থেকে রাজশাহী, খুলনা পর্যন্ত ট্রেন চলে এই রুটে। এই এলাকায় প্রথমবারের মতো রেল লাইন নির্মাণের সময় সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয় রেল সড়ক পথ। বাড়ির আশেপাশে হওয়ায় প্রতিদিন বিকালে স্থানীয়রা এই রেল লাইনে ঘুরতে বের হন। সন্ধ্যার পর ভিড় যেন আরও বাড়তে থাকে। রেল চালুর পরও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
রেল লাইনের পুলিয়া, মালিগ্রাম, সূর্যনগর, পাঁচ্চর এলাকায় প্রতিদিন বিকালে ভ্রমণপ্রেমীদের আড্ডা বসে! অযাচিতভাবে রেল লাইনে ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা দেওয়া এবং রেল লাইন পার হতে গিয়ে রেলে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শিবচরের রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা কমপক্ষে অর্ধশত। এদের মধ্যে ছবি তুলতে গিয়ে, ঘুরতে এসে মারা গেছে কমপক্ষে ১৫ জন। অন্যরা সড়ক পার হতে গিয়ে এবং আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছে বলে জানা গেছে। এদিকে গত মাসেও রেল লাইনের শিবচরের সূর্যনগর এলাকায় এক ব্যক্তি ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায়। চলতি বছরে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধডজন বলে রেল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
রেল লাইনে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, ‘বাড়ির কাছেই রেললাইন। বান্ধবীরা মিলে এখানে আসলাম। একটু সময় কাটানো, ছবি তোলার জন্য আসা। রেল লাইনে ঝুঁকি আছে, তারপরও অনেকেই আসেন ঘুরতে।’
মো. সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় রেললাইন নতুন। এজন্য কৌতুহল বেশি। আমরা মাঝে-মধ্যেই পরিবার-পরিজন নিয়েও স্টেশনে ঘুরতে আসি। তবে ট্রেন আসার সময় দূরত্ব বজায় রাখি। যখন প্রথম ট্রেন চালু হলো, তখন শিবচরের পাঁচ্চর রেললাইনে ছবি তুলতে গিয়ে বেশ কয়েকজন মারা গেছে। একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল এই রেললাইনে।’
শিবচর-ভাঙ্গা রেলওয়ের দায়িত্বরত রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রানহানির খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে আসি। আসলে মানুষের অসচেতনতার কারণেই এরকম দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। বিকাল হলেই রেললাইনে লোকজন আড্ডা দেয়। হাঁটাহাটি করে। অনেকেই ট্রেনের সিডিউল জানে না। আবার ট্রেন আসতে দেখেও পার হওয়ার চেষ্টা করে। ট্রেনের গতি সম্পর্কে ধারণা অনেকেরই নেই। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটে যায়।’
শিবচর স্টেশনের মাস্টার মো. সেলিম হোসেন বলেন, ‘এই লাইনটি খুবই গতিশীল। এখানে একশ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে রেল চলাচল করে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত রেললাইনে হাঁটাহাটি বন্ধ করতে হবে। মানুষের সচেতনতার কারণেই প্রাণহানি বেশি ঘটছে। স্টেশনের আশেপাশে দর্শনার্থীরা এলে আমরা তাদের সচেতন করার চেষ্টা করি। তাদেরকে ট্রেন চলাচলের শিডিউল মনে রাখতে বলি, যাতে অনাকাঙ্খিত ঘটনা না ঘটে। এই এলাকায় রেলে কাটা পড়ে প্রায়ই লোকজন মারা যায়!’


