সংকটাপন্ন পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ছাঁটাই আতঙ্ক বাড়ছে। নতুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেওয়া হলেও পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৮ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির অবস্থান, একক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (এইচআরএমএস), পরিচয়পত্র ও সমন্বিত বেতন কাঠামো এখনো কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ কর্মীদের।
এ নিয়ে সোমবার ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে স্বারকলিপি দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তাদের দাবি, নতুন ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে উচ্চ বেতনে কর্মকর্তা নিয়োগের কার্যক্রম চললেও পুরোনো পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের নতুন প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানান্তরের বিষয়টি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এতে চাকরির নিরাপত্তা, বেতন-ভাতা এবং পূর্বের দায়দেনা নিষ্পত্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কর্মীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের অনুমোদন দেয়।
এরপর ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর পাঁচ ব্যাংকে একজন করে প্রশাসক এবং পাঁচজন করে সহকারী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগের (বিআরডি) রেজল্যুশন স্কিম অনুসারে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। একই সঙ্গে পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক নিরীক্ষাও শুরু করা হয়।
তবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম এগোলেও কর্মীদের নতুন ব্যাংকে একীভূত করার প্রক্রিয়ায় একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরডির রেজল্যুশন স্কিমের ১৭ নম্বর নির্দেশনায় ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে প্রক্রিয়াটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
ফলে পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৮ হাজার কর্মীর মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, বেতন-ভাতা নিয়ে উদ্বেগ এবং পদ-পদবি নির্ধারণের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করলেও কর্মীদের জন্য অভিন্ন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতাও রয়ে গেছে।
স্বারকলিপিতে কর্মীরা দাবি জানিয়েছেন, একীভূতকরণের ক্ষেত্রে তাদের আগের চাকরির অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা, বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য পাওনা কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তা দ্রুত স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন ব্যাংকে কর্মীদের আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ জনবল কাঠামো সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহক, প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার আমানত এবং বিপুলসংখ্যক কর্মীর ভবিষ্যৎ এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। তাই কর্মীদের অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে তা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম, গ্রাহকদের আস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে একই ব্যাংকে ভিন্ন ভিন্ন বেতনকাঠামো থাকলে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো বৈষম্য দেখতে চায় না।
এদিকে কর্মীদের অভিযোগ, গত আগস্টে এমডি পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এক সভায় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পরিচয়পত্র এবং মাসের শেষ নাগাদ সমন্বিত বেতন কাঠামো চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।


