সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পর্যটন স্পট। নয়নাভিরাম সবুজ চা-বাগান, স্বচ্ছ পাথুরে নদী আর কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি দৃশ্যে ঘেরা এই অঞ্চল বার বার দর্শনার্থীদের মনকে টানে।
প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই স্বর্গীয় জনপদে ছুটে আসেন, বিশেষ করে ঈদ ও পূজার মতো ছুটির মৌসুমে।
তবে ছবির মতো সুন্দর এই দৃশ্যপটের আড়ালে পর্যটকদের জন্য রয়েছে এক হতাশাজনক বাস্তবতা–প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও মৌলিক অবকাঠামোর দিক থেকে অঞ্চলটি এখনো মারাত্মকভাবে পিছিয়ে।
প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেপাল ও মালদ্বীপের মতো আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রগুলো যখন নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল পরিবেশ–কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট, ইন্টার্যাকটিভ ম্যাপ এবং রিয়েল-টাইম জনসমাগমের ব্যবস্থাপনা–গড়ে তুলছে, তখন সিলেটের প্রধান পর্যটন আকর্ষণগুলো এখনো অনেকটাই অ্যানালগ যুগে আটকে আছে।
জাফলং, সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল ও লালাখালের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে পর্যটকেরা ডিজিটাল ম্যাপ ব্যবহার, জরুরি ফোন করা কিংবা অনলাইন সেবা গ্রহণের সুযোগ পান না। নারীদের জন্য পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা, মানসম্মত আবাসন ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থার মত মৌলিক অনেক সুবিধাই সিলেটে নেই।
পর্যটনবিষয়ক লেখক মোহাম্মদ খাতিবুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘বিশ্বের পর্যটনকেন্দ্রগুলো যখন স্মার্ট হাবে পরিণত হচ্ছে, তখন সিলেটের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দর্শনার্থীরা এখনো মৌলিক মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা নিয়েই সমস্যায় পড়ছেন। জাফলং ও সাদাপাথরের মতো জনপ্রিয় স্থানগুলোতে সমন্বিত ডিজিটাল ম্যাপ, কিউআর-কোডভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র কিংবা কেন্দ্রীয় ডিজিটাল সেবার ব্যবস্থা নেই।’
নিরাপত্তা ঘাটতিও সমানভাবে উদ্বেগজনক। নদীকেন্দ্রিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস কর্মী বা ডুবুরি না থাকায় পানিতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে উদ্ধারকাজে বেশ দেরি হয়, যা খুবই উদ্বেগজনক।
জাফলংয়ের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের ক্ষেত্রে আইনি ও কৌশলগত নানা জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী। তবে সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করতে টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
পরিবহন সংকটও সিলেটের পর্যটন আকর্ষণকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিছনাকান্দিতে দুর্বল সড়ক যোগাযোগের কারণে সরাসরি গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। ফলে পর্যটকদের অনেক সময় অস্থায়ী নৌকা কিংবা দুর্গম হাঁটার পথ ব্যবহার করতে হয়।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আনোয়ার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘যাতায়াতের দুর্ভোগের কারণে অনেক মানুষ কার্যত বিছনাকান্দির কথা ভুলেই গেছেন। যারা এত কষ্ট করে সেখানে যান, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসেন।’
আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় পর্যটকদের চোরাচালানবিরোধী তল্লাশির মুখে পড়ার ঘটনাও শোনা যায়।
এদিকে, ভঙ্গুর মিঠাপানির জলাভূমি বন রাতারগুলও মারাত্মক পরিবেশগত চাপের মুখে রয়েছে। নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি, শব্দদূষণ ও অপরিকল্পিতভাবে ফেলা আবর্জনা এর অনন্য জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। পাশাপাশি পর্যটকেরা ব্যস্ত মৌসুমে নৌকার ভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থার অভাব নিয়েও অভিযোগ করেন।
মানবসম্পদ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড প্রতিবছর সিলেটে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন গাইডকে প্রশিক্ষণ দিলেও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।
এর ফলে বিদেশি পর্যটকরা নির্ভরযোগ্য সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হন। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত কিছু ব্যক্তি পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও হয়রানি করে থাকেন।
‘উদ্বেগজনক সংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি সার্টিফিকেট পাওয়ার পরপরই দেশ ছেড়ে চলে যান,’ মন্তব্য করেন রহমান।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, প্রশিক্ষণ শেষ করার পরও সনদপ্রাপ্ত গাইডদের সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, যাতে তারা পর্যটন খাতে কাজ চালিয়ে যান।
এসব সমস্যার মূলে রয়েছে সিলেটে পৌঁছানোর দীর্ঘ ও দুর্ভোগপূর্ণ যাত্রা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় যানজট ও খানাখন্দে ভরা সড়কে যাতায়াত অনেকটাই ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে রয়েছে রেলওয়ের টিকিটের সংকট এবং বিমানের ভাড়ার অস্থিরতা।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমানে সিলেটের পর্যটন বিকাশের সবচেয়ে বড় বাধা হলো পরিবহনব্যবস্থা, বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে সিলেটের পর্যটন খাত আরও পিছিয়ে পড়বে।’
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য ধীরে ধীরে কিছু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। জাফলংয়ে ইউএনও অধিকারী জানান, জিরো পয়েন্টে সম্প্রতি নতুন করে রং করা ছাউনি দেওয়া বেঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট দর্শনীয় স্থান বা ভিউপয়েন্ট তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে বেঞ্চ স্থাপন করে সমস্যার সমাধান হবে না।
সিলেট যদি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনায় রূপ দিতে চায়, তাহলে পর্যটকেরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলার আগেই সরকারি কর্তৃপক্ষকে মহাসড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা, ডিজিটাল সংযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটক নিরাপত্তায় ব্যাপক ও সমন্বিত বিনিয়োগ করতে হবে।


