যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটির কাছে বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ইরান জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখছে দেশটির কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশ। ওই বিমানঘাঁটি সামরিক অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ব্যবহার করে থাকে।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় রোববার ভোরে পুলিশের কাছে গ্লুচেস্টারশায়ারের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড (আরএএফ) ঘাঁটির কাছে তিনটি সন্দেহজনক ভ্যানের খবর আসে। সেখানে বিস্ফোরক সদৃশ বস্ত পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা সেগুলো উদ্ধার করেন। প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা বিস্ফোরক যন্ত্রের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
পরে সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে গ্লুচেস্টারশায়ারের গ্রাম এলাকা থেকে পাঁচজনকে আটক করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, ভোররাতে অন্ধকার একটি সড়কে কয়েকজন ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। সে সময় তাদের গায়ে পোশাক ছিল না। আত্মঘাতী পোশাক বা লুকানো অস্ত্রের ঝুঁকি এড়াতে পুলিশ এমন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, রোববার রাত ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে তারা তিনটি সন্দেহজনক যানবাহনের বিষয়ে একটি ফোন পায়। এসব যানবাহন বিমানঘাঁটির দিকে যাচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে হুইলফোর্ড এলাকা থেকে পাঁচজনকে বিস্ফোরক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেন। পরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির অভিযোগেও তাদের আটক করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, সাধারণ এক নাগরিকের সতর্কতার কারণেই আরএএফ ঘাঁটিতে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়েছে। ওই ব্যক্তি গভীর রাতে গ্রামাঞ্চলে কয়েকজন মানুষের অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে পেয়ে জরুরি নম্বরে ফোন করেন।
গার্ডিয়ান জানায়, বিস্ফোরক পাওয়ার পর সম্ভাব্য হামলার ঘটনায় কটসওল্ডস এলাকার হুইলফোর্ড গ্রামের ৮৫টি পরিবারকে দ্রুত সাইরেনসেস্টার অবসরকেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়। সাদা রঙের ওই তিনটি ভ্যান ঘিরে ৪০০ মিটার নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়। প্রথমে সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল রোবট ব্যবহার করে ভ্যানগুলো পরীক্ষা করে। উদ্ধার করা সন্দেহভাজন বিস্ফোরকগুলো কার্যকর ছিল কি না, তা জানতে পরীক্ষা চলছিল।
তিনটি ভ্যানের মধ্যে একটিতে জ্বালানি কোম্পানির লোগো এবং একটি ফোন নম্বর দেখা গেছে। তবে ওই নম্বরের নির্ধারিত সংখ্যার মধ্যে একটি সংখ্যা কম থাকায় তা ভুয়া নম্বর বলে ধারণা করছে পুলিশ। একই নামে থাকা একটি প্রকৃত জ্বালানি কোম্পানি এ ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, অনুমতি বা জানানো ছাড়াই কোনো গাড়িতে তাদের নাম ব্যবহার করায় তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে তদন্তে তারা কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল। গত জুলাইয়ে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমানের ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করেছিল। সে সময় তারা যুক্তরাজ্যকে হুঁশিয়ার করে বলেছিল, ‘ইরানের ভূখণ্ডে আগ্রাসনের জন্য ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটি আমাদের বাহিনীর জন্য বৈধ লক্ষ্য।’
যুক্তরাজ্যের কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখন হামলার উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। বিমানঘাঁটির কাছে গ্রেপ্তার এবং তেহরানের আগের সতর্কবার্তার কারণে তদন্তকারীরা ও সরকার ইরানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কোনো সম্ভাবনাই বাদ দেওয়া হচ্ছে না। জঙ্গিবাদী বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা এখনো ‘গুরুতর’ পর্যায়ে রয়েছে, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর। এর অর্থ হলো দেশটিতে হামলার আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি।
এ হামলার প্রচেষ্টায় অন্য কোনো বিদেশি পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ। এর আগে ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় বিদেশে বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদি এই ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তাহলে তেহরানের সঙ্গে লন্ডনের উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যে কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে ইরানের নাম জড়িয়েছে। এর মধ্যে লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিন এলাকায় চারটি ইহুদি সম্প্রদায়ের অ্যাম্বুলেন্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও রয়েছে। তবে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে কথিত হামলার পরিকল্পনাকে আরও গুরুতর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে। কারণ, স্থানীয় ওই বাসিন্দার জরুরি ফোন না পেলে হয়তো পুলিশ ভ্যানগুলোতে অভিযান চালাতো না। কাজেই কর্তৃপক্ষ এই সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল এবং তারা বড় ধরনের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। সন্দেহভাজন পাঁচজনের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি অসাধারণ ছিল। ব্রিটেন দারুণ কাজ করেছে।’
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই অভিযান গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়নি। অর্থাৎ তদন্তকারীরা আগেভাগে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম লিভারপুলে লেবার পার্টির সম্মেলনে থাকা অবস্থায় বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন। জরুরি ভিত্তিতে ফোনে কথা বলার জন্য তিনি সে সময় সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে নির্ধারিত একটি ফুটবল ম্যাচে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেন। তিনি বলেন, ‘এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’
রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির রানওয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। ভারী বোমারু বিমান যেমন বি-১ ও বি-৫২ পরিচালনার উপযোগী করে এটি তৈরি করা হয়েছে। এসব বিমান বড় ধরনের অস্ত্র বহন করতে পারে, যার মধ্যে ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসকারী বোমাও রয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের’ জন্য ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। এরপর চারটি মার্কিন বোমারু বিমান ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে অবতরণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের জন্য ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার শুরু করে।


