সংবিধানে মৌলিক কোনো সংশোধনী আনা হলে নতুন করে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। রোববার তিনি এ কথা জানান। তবে, বিরোধী দলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এর বিরোধিতা করে এই উদ্যোগকে ‘হাস্যকর, অবৈধ ও স্বৈরতান্ত্রিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সাংবিধানিক সংশোধনীবিষয়ক বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে কমিটি জানায়, সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হলে জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
কমিটির প্রধান সালাহউদ্দিন বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। এরপর জানুয়ারিতে সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন এবং রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে গণভোট আয়োজনের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে বিরোধী দলগুলো বলছে, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ইতোমধ্যে তাদের মতামত জানিয়ে দিয়েছে। তাই নতুন করে আর কোনো গণভোট তারা মেনে নেবে না।
রোববার সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। দুপু্র আড়াইটাই শুরু হয়ে বৈঠকটি বিকাল সোয়া ৫টায় শেষ হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, সংবিধানের মৌলিক কোনো বিধানে পরিবর্তন আনা হলে সংশোধনী পাসের পর নতুন করে গণভোট আয়োজনের কথা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সাংবাদিকরা কমিটিকে অনুরোধ করেন, সাংবিধানিক সংস্কার যেন জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে করা হয় এবং সর্বোচ্চ আস্থা তৈরির মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়।
জবাবে কমিটি জানায়, বিরোধী দলগুলোকে পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
বিরোধী দলগুলো এখন আলোচনায় অংশ না নিলেও সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপনের পর তারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে বলে কমিটি আশা প্রকাশ করে।
জামায়াত, এনসিপি ও অন্যান্য বিরোধী দল জুলাই সনদের গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন এবং একটি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। বিএনপি সংস্কার পরিষদ গঠনে সম্মত না হওয়ায় এসব দল সাংবিধানিক সংশোধনীবিষয়ক বিশেষ কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয়নি।
এর আগে তারা জানিয়েছিল, ১১ দলীয় জোটের সংলাপেও তারা অংশ নেয়নি। তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের দাবি কেবল সংবিধান সংশোধন নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক সংস্কার। তাদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের দেওয়া ক্ষমতা এবং গণভোটের মাধ্যমে একটি সংস্কার পরিষদকে দেওয়া ক্ষমতা এক নয়।
রোববার সন্ধ্যায় টাইমসের সঙ্গে কথা বলার সময় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ যখন গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ নিয়ে তাদের মতামত জানিয়ে দিয়েছেন, তখন আবার গণভোট আয়োজনের চিন্তা হাস্যকর। দেশের মানুষ আরেকটি গণভোট মেনে নেবে না।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য সারওয়ার তুষার টাইমসকে বলেন, ‘জনগণ ইতোমধ্যে গণভোটের মাধ্যমে তাদের রায় দিয়েছে। এখন সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা ব্যবহার করে বিএনপি একটি অবৈধ ও স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’
সালাহউদ্দিন আহমেদ বিরোধী দলগুলোকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানালেও তুষার বলেন, তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন এবং আলোচনায় অংশ নেবেন না। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দলগুলো লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সালাহউদ্দিন বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ১৪২ অনুচ্ছেদ অথবা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনা হলে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশোধনী বিল প্রস্তুত করবে। আগামী জানুয়ারিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করা হতে পারে। সংসদ সংশোধনী পাস করার পর যেসব বিষয়ে গণভোট প্রয়োজন হবে, সেগুলো ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। গণভোটে অনুমোদন পাওয়ার পরই রাষ্ট্রপতি সংশোধনীগুলোতে সই করবেন।
গণভোটের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাধারণভাবে গণভোট দুই ধরনের–সাংবিধানিক বিষয়ে গণভোট এবং আইনগত বিষয়ে গণভোট।
তিনি বলেন, ‘আইনগত বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে। সংবিধানে এমন কোনো বিধান নেই যে সাংবিধানিক গণভোট ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে না।’
কমিটির চেয়ারম্যান আরও জানান, সংবিধানের গণভোটের আওতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাবও রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান এবং আরও দুটি অনুচ্ছেদকে গণভোটের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনো সংসদ এসব বিধান সংশোধন করতে চাইলে জনগণের অনুমোদন নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধানগুলো ভবিষ্যতে পরিবর্তন করা হলেও সেক্ষেত্রে গণভোট আয়োজন করতে হবে। বিএনপি এসব সংশোধনীর ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক করারও প্রস্তাব দিয়েছে।


