মিত্র থেকে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত

মিত্র থেকে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত
ইলাস্ট্রেশন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

আড়াই দশক আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজপথে একসঙ্গে আন্দোলন করা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন সংস্কার, বিরোধী দলকে পাশ কাটানো ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান এই বিভাজনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাজপথে নতুন পর্যায়ের আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে জোটটির চলমান বিভাগীয় লংমার্চ কর্মসূচি শেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় বৃহৎ মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ওই মহাসমাবেশ থেকে সংস্কার বাস্তবায়নসহ নিজেদের দাবির বিষয়ে সরকারকে সময়সীমা বেঁধে আলটিমেটাম দেওয়ার কথা ভাবছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। দাবি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে জামায়াত জোট।

সরকার গঠনের পরপরই জামায়াতের কর্মসূচি ভালোভাবে নেয়নি বিএনপি। অন্যদিকে, জামায়াতও সংস্কার ইস্যু, দলীয়করণ এবং বিরোধী দলকে উপেক্ষার চেষ্টাকে সহজভাবে দেখছে না। জামায়াত রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত রাখলে বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোও পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ টাইমসকে বলেন, ‘সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে বিএনপি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। দলটিকে শিগগিরই এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। সংস্কার বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি, সব ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে উপেক্ষা করা বন্ধ এবং জনগণের দাবি পূরণের জন্য কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান জামায়াতের বক্তব্য এবং তাদের সাম্প্রতিক লংমার্চকে ‘হঠকারী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এদিকে, রোববার সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ঘোষিত নতুন করে গণভোটের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে বিরোধী দল। তারা এই প্রস্তাবকে হাস্যকর বলে বর্ণনা করেছে।

মহাসমাবেশে আলটিমেটামের চিন্তা

বিএনপি দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১৪ নভেম্বরের মহাসমাবেশ থেকে সরকারকে এক সপ্তাহ বা কাছাকাছি সময়ের আলটিমেটাম দিতে পারে জামায়াত জোট। কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জোটের নেতারা। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিতেই ওই কর্মসূচি দেওয়া হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবিতে সেপ্টেম্বর থেকে বিভাগীয় শহরে লংমার্চ শুরু করেছে জোটটি। ১০ অক্টোবর খুলনা ও ২৪ অক্টোবর সিলেটে লংমার্চের পর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা রয়েছে। তবে বেশি মানুষ জড়ো করার জন্যে মহাসমাবেশ এক-দুই সপ্তাহ পেছাতে পারে বলেও জোটে আলোচনা রয়েছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমসকে বলেন, ‘দলীয় দাবি নয়, আমরা গণদাবি নিয়ে রাজপথে। আগামীতে সরকারের প্রতিটি অন্যায়ের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি প্রয়োজনে রাজপথে সমুচিত জবাবও দেব। মহাসমাবেশ আমরা বৃহৎ পরিসরে করতে চাইছি। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি আসবে।’

আরও পড়ুন

জোটের অন্যান্য দলের একাধিক নেতাও কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘বিরোধী দল বসে থাকবে না। বিএনপিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফল পেতেই হবে। আমরা কর্মসূচিতে রয়েছি। আগামীতেও জোটগত কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি নিজস্ব কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে।’

মাঠে থাকবে বিএনপি

জামায়াতের আন্দোলনের হুংকারকে গুরুত্ব না দিলেও সতর্কভাবে মাঠে থাকতে চায় বিএনপি। এক সময়ের মিত্র দলটিকে বিএনপি এখন আর ‘মিত্র’ হিসেবে দেখছে না। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও সম্পর্ক নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল টাইমসকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বা সমঝোতায় ছিল। আবার ১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনেও সমর্থন দিয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারে জামায়াতের দুই নেতা মন্ত্রীও হন। তবে ১/১১-এর সময় জামায়াত বিএনপি সরকারের দুর্নীতির দায় নিতে অস্বীকৃতি জানায়। জামায়াত কার বন্ধু তা বুঝতে তাদের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতের আন্দোলনকে পাত্তা দেওয়ার কিছু নেই। তারপরও ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী ও জামায়াতের তৎপরতা রুখতে আমরা আগামীতে সতর্কভাবে মাঠে থাকব।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘শুরু থেকে জামায়াত ফ্যাসিবাদী কায়দায় হাঁটছে। ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশকে এগিয়ে নিতে বিএনপি জাতীয় ঐক্য চাইলেও জামায়াত চাইছে না। যে কারণে দলটি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেয়নি। তারপরও বিএনপি সরকার দেশের প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য চাইছে।’

ইতিমধ্যে বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলো দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে গত কয়েকদিন কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের চেয়েও জামায়াতের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির মন্ত্রী ও এমপিরা।

মিত্রতা থেকে যেভাবে ফাটল

১৯৯৯ সালে বিএনপি ও জামায়াত জোট গঠনের পর দীর্ঘদিন পাশাপাশি পথ চললেও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই মিত্রতায় ফাটল ধরতে শুরু করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দুই দলের সম্পর্কের বাইরে টানাপোড়েন থাকলেও এক ধরনের সমঝোতা ছিল বলে মনে করা হয়। নির্বাচনে বিএনপি জোট সরকার গঠন করেছে, আর বিরোধী দলে বসেছে জামায়াত-এনসিপি জোট।

নির্বাচনের পর সংস্কার ইস্যু, বিরোধী দলের এমপিদের এলাকায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের দিয়ে উন্নয়ন কাজ তদারকি, সরকারি বরাদ্দে বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতি বৈষম্য এবং সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ নিয়ে দুই দলের সম্পর্কে আরও ফাটল ধরে। ক্রমেই তা তিক্ততায় পরিণত হয়েছে।

নির্বাচনের পর থেকেই তিক্ততার শুরু

নির্বাচনের পর সংসদে সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের দূরত্ব প্রকাশ্যে আসে। বিএনপি সংবিধান অনুযায়ী সংস্কারের কথা বললেও জামায়াত জোট জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে পৃথক ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ চায়। জামায়াতের এমপিরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি তা করেনি।

গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারি দল ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করলেও জামায়াত ও এনসিপি এর কাঠামোর বিরোধিতা করে কমিটিতে নাম দেয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়েও দুই পক্ষের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়। সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে, ১৫টি সংশোধন করে আইন করার এবং ২০টির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আইন না করার সুপারিশ করে। পরে ৯৭টি অপরিবর্তিতভাবে, ১৩টি সংশোধন করে পাস এবং সাতটি তামাদি হওয়ার কথা জানানো হয়।

গণভোট, বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পরিবর্তন ও বাতিল করা নিয়ে জামায়াত জোটের প্রবল আপত্তি রয়েছে।

কোনদিকে যাচ্ছে রাজনীতি?

বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের নতুন সমীকরণের প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান দীর্ঘ হলে সরকারের জন্যও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। এই তিক্ততা সংস্কার বাস্তবায়নের বিরোধ, নাকি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ বদলের প্রচেষ্টা–তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, ‘বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘমেয়াদে মুখোমুখি অবস্থান বা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে গেলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সুযোগ নিতে পারে। ফলে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।’

তার মতে, একদিকে আওয়ামী লীগের তৎপরতা মোকাবিলা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad