একসময় উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের ঋণকে নিরাপদ মনে করতো বাংলাদেশ। কারণ, তখন কম সুদে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকত। কিন্তু গত পাঁচ বছরে সেই জাপানি ঋণের সুদের হার চার গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
আগামী অক্টোবরে তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাপানি ঋণের সঙ্গে চেপে বসছে একের পর এক কঠিন শর্ত। এসবের কারণে নতুন করে জাপানের থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে এখন বেশ সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে সরকার।
সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় জানানো হয়, ভবিষ্যতে জাপানের সঙ্গে যেকোনো ঋণ চুক্তি করার আগে আরও সতর্ক হতে হবে। কারণ, জাপান সুদের হার ক্রমাগত বাড়াতে থাকায় বিষয়টি নিয়ে অখুশি বাংলাদেশ সরকার।
একনেক সূত্রের খবর, জাপানি অর্থায়নে চলা এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান) প্রকল্পে খরচ অন্যান্য দাতা সংস্থার খরচের তুলনায় অনেক বেশি। তা ছাড়া জাপান দিন দিন সুদের হারও বাড়িয়ে চলেছে। তাই নতুন করে জাপানি ঋণের ফাঁদে পা দেওয়ার আগে তা গভীরভাবে যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একনেক সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি সরকারের এই অস্বস্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান জাইকা মূলত তাদের নিজেদের নিয়ম ও মান মেনে কাজ করে। ফলে ঠিকাদার থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল-সবই জাপান থেকে আনতে হয়। দরপত্রেও জাইকার তালিকাভুক্ত বিক্রেতা ও পণ্যের বাধ্যবাধকতা থাকে। এতে চাইলেও বিকল্প কিছু করার সুযোগ থাকে না।
প্রতিমন্ত্রী জানান, অন্যান্য সহযোগী সংস্থার চেয়ে জাইকার ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ অনেক বেশি পড়ে।
প্রতিমন্ত্রীর কথার প্রমাণ পাওয়া যায় এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার টাকায় তৈরি হতে যাওয়া এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন) রুটের চেয়ে জাপানের টাকায় তৈরি এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান) রুটে কিলোমিটারপ্রতি খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সাউদার্ন রুটের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা (কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা)। অথচ সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের নর্দান রুটে মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা (কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা)।
শুধু প্রকল্পের খরচই নয়, জাপানি ঋণের সুদের হারও হু হু করে বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাব বলছে, ২০২০ সালে যেখানে মাত্র শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ সুদে জাপানের সঙ্গে সাতটি ঋণ চুক্তি হয়েছিল। পরে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ। ২০২৩ সালে সুদের হার হয় এক দশমিক দুই শতাংশ, ২০২৪ সালে এক দশমিক সাত শতাংশ এবং ২০২৫ সালে তা দুই শতাংশে ঠেকে। এমনকি চলতি বছরের জুনে বাজেট সহায়তা হিসেবে নেওয়া ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঋণে সুদের হার ছিল তিন দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। আগামী অক্টোবরে যা সাড়ে তিন শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইআরডির।
ইআরডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সুদের হার কমানোর জন্য জাপানের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরেই দর-কষাকষি চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজের কাজ কিছু হয়নি। জাপান প্রতি ছয় মাস পর পর সুদের হার পর্যালোচনা করে। আগামী অক্টোবরের পর্যালোচনায় সুদ আরও বাড়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, জাপান সরকারের নীতি বদলে গেছে এবং সরকারও সে অনুযায়ী নতুন কৌশল সাজাচ্ছে। সামনে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে এই সংকট নিয়ে আলোচনা হবে।
তিনি আরও বলেন, একসময় উন্নয়ন ঋণের ক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশ সরকারের ‘প্রথম ও সেরা পছন্দ’ থাকলেও সেই দিন আর নেই—আর এই বার্তাটি জাপানও বুঝে গেছে।
এই বিষয়ে ইআরডির জাপান অধিশাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলাম টাইমসকে জানান, জাপানের কাছে সুদের হার কমানোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে এবং জাপানের সিদ্ধান্তগুলো ইআরডি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে বিষয়টি নিয়ে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।
পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির যে হাল, তাতে আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার আশা করা ভুল। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো দিন দিন তাদের সুদের হার ও শর্ত কঠিন করে তুলছে। ফলে বাংলাদেশকে এখন থেকে তুলনামূলক বেশি সুদ ও কড়া নিয়ম মেনেই ঋণ নিতে হবে।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, আসল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের হাতেই আছে। নিজের দেশের লাভ-ক্ষতি হিসাব করেই ঋণ নিতে হবে। চীনসহ অনেক দেশই জাপানের মতো নিজেদের ঠিকাদার ও মালামাল ব্যবহারের শর্ত দেয়। তাই কোথায় থেকে ঋণ নিলে দেশের সবচেয়ে বেশি লাভ হবে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পাবে, তা বিচার-বিবেচনা করেই বাংলাদেশকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।


