চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড ১৫ বছরের জন্য বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পর গত বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিদেশি কোম্পানির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
পুরো প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলে বাস্তবায়ন করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা ও দেখাশোনার দায়িত্বে থাকবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এবং বিভিন্ন বন্দর শ্রমিক সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই এনসিটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে।
আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর বক্তব্য, উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কোনো অভিজ্ঞ বিদেশি কোম্পানি নিয়োগ দিলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদী ইজারা বা কনসেশনের মাধ্যমে টার্মিনালটি অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবে না।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, আর এর কনটেইনার ওঠানামার বড় একটি অংশ সম্পন্ন হয় এনসিটিতে। ফলে ১৫ বছরের জন্য এই সিদ্ধান্ত বন্দরের আয়, পরিচালনা এবং দেশের সার্বিক স্বার্থে কী প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারীদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর হাতে এনসিটি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে তারা এই সিদ্ধান্তটি দ্রুত পুনর্বিবেচনা করে কার্যক্রম স্থগিত করার আহ্বান জানায়।
সংগঠনের যৌথ সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৭ সালে বিগত সরকারের আমলে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা করে এই চুক্তি তড়িঘড়ি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন।
বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার এবং সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু সরকারের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা অভিযোগ করেন, এনসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মন্ত্রিসভা কমিটির মূল আলোচনায় না রেখে ‘বিবিধ’ এজেন্ডায় রেখে তড়িঘড়ি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তারা বলেন, সরকারি টাকায় তৈরি এই টার্মিনালটি ইতিমধ্যে অত্যন্ত সফলভাবে চলছে। এটি সরকারের নিজের অধীনে রেখে আরও বেশি আয় করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে না দেখেই কেন অন্য কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে—সরকারকে তার স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে খসড়া চুক্তি ও এর আর্থিক লেনদেনের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি তারা একটি নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক ও কারিগরি মূল্যায়ন, বন্দর কর্মচারীদের চাকরির নিশ্চয়তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সার্বিক নিরাপত্তার জোরালো দাবি জানান। জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে নির্মাণের পর থেকে ‘সাইফ পাওয়ারটেক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনা করে আসছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে এর পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড’ (সিডিডিএল)-এর হাতে দেওয়া হয়।


