জনপ্রশাসনের আদেশ অমান্য করল দুর্যোগ ব‍্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়

জনপ্রশাসনের আদেশ অমান্য করল দুর্যোগ ব‍্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়
Advertisement
Advertisement

ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগকালে অনুসন্ধান, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা ও জরুরি যোগাযোগের জন্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ (৩য় পর্যায়) প্রকল্পের টেন্ডারে আর্থিক সুবিধা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কাজী শফিকুল আলমকে বদলির দুই সপ্তাহ পরেও তিনি এখনো বহাল রয়েছেন।

তার স্থলে নতুন পিডি হিসেবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সামসুন নাহার সুমিকে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু নতুন পিডি সুমির যোগদান আটকে দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর নির্দেশে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ওই প্রকল্পের পিডি ও যুগ্মসচিব শফিকুলকে বদলি করা হলেও দায়িত্ব হস্তান্তর না করে শফিকুল আলম বদলি ঠেকাতে জোর তদবির চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, নতুন পিডি সামসুন নাহার সুমি তার সাবেক কর্মস্থল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে রিলিজ নিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন।

কিন্তু ২৮ সেপ্টেম্বর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন অধিশাখা) জাহাঙ্গীর আলমের সই করা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, সামসুন নাহার সুমি গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুর্যোগ মন্ত্রণালয় যে যোগদানপত্র দাখিল করেছেন, প্রশাসনিক কারণে তার যোগদানপত্র গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইফুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘নতুন পিডিকে যোগদান না করার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বিষয়। যিনি যোগদান করতে চেয়েছিলেন তাকে নেয়া হয়নি। এরচেয়ে বেটার অপশন রয়েছে। এটা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলাপ হয়েছে।’

নতুন পিডি সামসুন নাহার সুমি বলেন, গত ১৫ তারিখে তাকে প্রকল্পটির পিডি হিসেবে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি জেনেছি আমার যোগদানপত্র গ্রহণ করা হয়নি মর্মে জনপ্রশাসনে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

তবে বদলি ঠেকাতে চেষ্টার বিষয়টি অস্বীকার করে শফিকুল আলম বলেন, ‘গত ২২ সেপ্টেম্বর আমি সচিবের কাছে রিলিজের জন্যে চিঠি দিয়েছি। শিগগির রিলিজ নিতে পারব হয়তো।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, সম্প্রতি পিডি শফিকুল বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে অনিয়মের মাধ্যমে একচেটিয়া ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে ভুক্তভোগীরা সম্প্রতি মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।

আওয়ামী লীগের সময়ে নিয়োগকৃত দাপুটে পিডি শফিকুল বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ ছিল, বেশিরভাগ দরপত্রে সর্বনিন্ম দরদাতাকে বাদ তিনি ওই একটি প্রতিষ্ঠান কাজ দেন। এক পর্যায়ে মন্ত্রী শফিকুলকে বদলির নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বিষয়টি নিয়ে দুর্যোগ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এসএমএস পাঠালেও তিনি রেসপন্স করেননি।

আরও পড়ুন

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, এ ব্যাপারে মন্ত্রী কথা বলবেন না।

এদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব টাইমসকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘স্বাভাবিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি অর্ডার করলে অন্য মন্ত্রণালয় সেটি না মানার ঘটনা স্বাভাবিক না। এক্ষেত্রে আদেশ বহাল থাকলেও সুমিকে ‘প্রশাসনিক’ কারণে যোগদান গ্রহণ না করার বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।’

সর্বনিম্ন দরদাতা নয়, কাজ পায় সায়েন্স হাউজ

নভেম্বর ২০২০ থেকে ২০২৭ সালের জুন মেয়াদের প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগকালে অনুসন্ধান, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা ও জরুরি যোগাযোগের জন্য যন্ত্রপাতি ক্রয়ই ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

মন্ত্রণালয় ও প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, শফিকুল ২০২২ সালের শেষ ভাগে প্রকল্পটির ডিপিডি (উপ-প্রকল্প পরিচালক) হিসেবে যোগ দেন। এর কিছুদিন পিডি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

নিয়োগের পর থেকেই বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজ প্রতিষ্ঠানকে অনিয়ম করে কাজ বাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে তুলনামূলক বেশি দরে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ায় সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ও হয়েছে।

টাইমসের হাতে আসা চারটি দরপত্রের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজ সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল না।

কোথাও দ্বিতীয়, কোথাও তৃতীয় এবং একটি ক্ষেত্রে ষষ্ঠ অবস্থানে থেকেও প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ পেয়েছে। চারটি দরপত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৫৪ লাখ ১ হাজার ৫৩৫ টাকা।

২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি দরপত্রে অনুরাগ ট্রেডার্স ১৩ কোটি ৯৬ লাখ ৬৫ হাজার ২০০ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন হলেও সায়েন্স হাউজের দর ছিল ১৪ কোটি ৩৩ লাখ ২ হাজার ২ টাকা। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার ৮০২ টাকা।

আরেকটি দরপত্রে অনুরাগ ট্রেডার্সের দর ছিল ৭ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। সায়েন্স হাউজের দর ৮ কোটি ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ১৮১ টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় ৩৩ লাখ ৮৯ হাজার ১৮১ টাকা।

তৃতীয় দরপত্রটি এলিট সলিউশনস ৭ কোটি ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৩০ টাকা ৮ পয়সা দর দিয়ে সর্বনিম্ন হলেও সায়েন্স হাউজ ৭ কোটি ৫১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় কাজ পায়। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৩৪ লাখ ৩২ হাজার ৩৭০ টাকা।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের একটি দরপত্রে বেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স ১২ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার ৮৯২ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন হলেও সায়েন্স হাউজের দর ছিল ১৫ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ৭৪ টাকা। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৪৯ লাখ ৪৫ হাজার ১৮২ টাকা।

নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে পিডি শফিকুল আলম বলেন, ‘আমি নিয়ম মেনে সব কাজ করেছি। কোন ঠিকাদার কাজ না পেলে এ ধরনের অভিযোগ করেন।’

সর্বনিম্ন দরদাতা না হয়েও বারবার সায়েন্স হাউজ কাজ পাওয়ার বিষয়ে শফিকুল বলেন, ‘সর্বনিন্ম দরদাতা হলেই তিনি কাজ পাবেন বিষয়টি এমন নয়। এখানে সিস্টেমের ব্যাপার রয়েছে। এ ছাড়া টেকনিক্যাল টিম এ বিষয়ে মতামত দেয়। সে অনুযায়ী কাজ হয়।’

শফিকুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পুরোনো

২০২৫ সালের এপ্রিলেও মেসার্স সরকার কবির আহমদ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শফিকুল বিরুদ্ধে সায়েন্স হাউজকে অনিয়ম করে চারটি দরপত্রের কাজ দেওয়ার অভিযোগ করে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ), মন্ত্রণালয়ের সচিব ও তৎকালীন উপদেষ্টার কাছে। অন্য প্রতিষ্ঠান এইচটিএমএস এই ধরনের অভিযোগ ছিল।

ওই অভিযোগের পর গঠিত রিভিউ প্যানেল প্রকল্পের আওতায় ৯টি প্যাকেজে ৯টি দরপত্রে অন্তত চারটি প্যাকেজে সায়েন্স হাউজকে অনিয়মের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার প্রমাণ পায়।

সে সময়ের অভিযোগকারী সরকার কবির আহমদ বলেন, ‘রিভিউ প্যানেল দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অসংগতি চিহ্নিত করে সায়েন্স হাউজের সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও নতুন করে দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করে। এরে মাধ্যমে আমার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। পরে সায়েন্স হাউজ হাইকোর্টে গিয়ে রিট করে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর পিডির অনুরোধে আমি কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা থেকে বিরত থাকি।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজের চিফ অপারেটিং অফিসার রেদওয়ানুল ইসলাম, বলেন, ‘দরপত্রের কারিগরি শর্ত ও অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ না করলে সর্বনিম্ন দরদাতার প্রস্তাবও বাতিল হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, কোনো দরদাতা প্রতিষ্ঠান নয়। কোনো প্রকল্প পরিচালক বা সরকারি কর্মকর্তা অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। আমরা সব সময়ই আইন মেনে, সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad