সরকারি কর্মকর্তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানানোর দৃশ্য পরিচিত। চট্টগ্রামে দেখা গেল উল্টো ছবি। ফুল নিতে নয়, ফুল দিতে গেলেন জেলা প্রশাসক। সঙ্গে সম্মাননা স্মারক।
যাদের কাছে গেলেন, তারা কোনো পদস্থ কর্মকর্তা বা বিশিষ্ট ব্যক্তি নন। তারা চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস) শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী। প্রায় এক যুগ ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা নিজেদের উদ্যোগে সরিয়েছেন তারা।
সেই কাজের স্বীকৃতি দিতেই মঙ্গলবার সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সে হাজির হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও সিজেকেএসের সভাপতি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। ব্যবসায়ী নেতাদের হাতে তুলে দেন ফুল ও সম্মাননা স্মারক।
জেলা প্রশাসকের ভাষায়, ‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, ফুলও দেয়।’
চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়িতে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামসংলগ্ন সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্স। গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় বছরের পর বছর জমতে থাকে ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য। একপর্যায়ে তা বড় স্তূপে পরিণত হয়।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, সেখানে জমেছিল আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক বর্জ্য। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে জমেছিল এসব আবর্জনা।
বর্জ্যের স্তূপে দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি মানুষের চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছিল। ছিল মশার প্রজনন ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও। জেলা প্রশাসক বলেন, বর্জ্যের মধ্যে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন লাগলে পাশের মার্কেট ও স্টেডিয়ামও ঝুঁকিতে পড়তে পারত।
‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ স্লোগানে জেলাজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কার্যক্রম চালাচ্ছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়।
জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার মসজিদে একযোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত সীতাকুণ্ডে বিশেষ কর্মসূচির পর কর্ণফুলীতেও একই ধরনের কার্যক্রম নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় নজরে আসে সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সের বর্জ্যের স্তূপ।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সিজেকেএসের অ্যাডহক কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। জেলা প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতি নিজেদের উদ্যোগে বর্জ্য অপসারণ শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যেই সরানো হয় এক যুগ ধরে জমে থাকা জঞ্জাল।
দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জায়গাটি পরিষ্কার করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। জেলা প্রশাসনের উৎসাহ ও সহযোগিতা পাওয়ার পর তারা কাজে নামেন।
তবে কাজের স্বীকৃতি দিতে জেলা প্রশাসক নিজেই ফুল নিয়ে আসবেন, তা ভাবেননি কামাল।
তিনি বলেন, ‘ডিসি মহোদয় নিজে এসে আমাদের ধন্যবাদ জানাবেন, ফুল দিয়ে উৎসাহিত করবেন—এটা ভাবিনি। তার এই স্বীকৃতি আমাদের উৎসাহিত করেছে।’
সমিতির সভাপতি মুকলেসুর রহমান বলেন, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তারা কাজটি করেননি। মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই উদ্যোগটি নিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের স্বীকৃতি তাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।
চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিনও ঘটনাটিকে ব্যতিক্রমী বলছেন।
তিনি বলেন, ‘সাধারণত কোনো কর্মকর্তা এলে তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এখানে ডিসি সাহেব নিজেই এসে যাঁরা কাজটি করেছেন, তাঁদের ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমন ঘটনা আমি আগে দেখিনি।’
ব্যবসায়ীদের সম্মাননা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, শহর বদলাতে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের মধ্যেও দায়িত্ববোধ তৈরি হতে হবে।
তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, জেলা প্রশাসন ফুল দেয়। আমরা তাদের হাতে ফুল দিয়েছি। ভালো কাজের জন্য স্মারক উপহার দিয়েছি।’
শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক বর্জ্য সরানো সহজ কাজ ছিল না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘হয়তো এই ফুল সামান্য। কিন্তু তাঁদের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, যে সম্মান—সেটা অনেক বড়। সেই সম্মান দেখাতেই আজ তাঁদের কাছে এসেছি।’
বর্জ্য সরিয়েই কাজ শেষ হচ্ছে না। এত দিন আবর্জনার স্তূপে ঢাকা জায়গাটি এবার সাজানোর পরিকল্পনা করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক জানান, সেখানে বাগান করা হবে। থাকবে বসার জায়গা ও পানির ব্যবস্থা। এলাকাটি সৌন্দর্যবর্ধনের আওতায় আনা হবে।


