সরকারি নির্দেশের পরেও অস্ত্র জমা দেননি ২০ হাজারেরও বেশি লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক। গণঅভ্যুত্থানের সময়ে খোয়া যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার।
অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে লাইসেন্স দেওয়ার এবং বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের অনেক ঘটনা ঘটেছে। তাই নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবার রাজনৈতিক দল না দেখে মানুষের আসল প্রয়োজনীয়তা দেখেই কেবল লাইসেন্স দেওয়া উচিত।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে অস্ত্র আমদারিকারক ও বিক্রেতাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ আর্মস ডিলার অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনটির নেতারা স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। তারা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি অস্ত্রের লাইসেন্স ফি কমানোরও দাবি জানিয়েছিলেন। যদিও ফি কমানোর বদলে অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক তানভীর আহমেদ টাইমসকে বলেন, বারবার বৈঠকের পর বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার গুরুত্ব বুঝতে পারে সরকার। এরপর জেলা প্রশাসকদের নতুন আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
তিনি জানান, প্রায় দুই বছর ধরে নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের কাজ একপ্রকার বন্ধ ছিল। বেচাকেনা না থাকায় অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
তানভীর আহমেদ আরও জানান, তার প্রতিষ্ঠান ‘আহমেদ হোসেন অ্যান্ড কোম্পানি’ বিভিন্ন ব্যাংক, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আনসারের সঙ্গে কাজ করায় এখনো টিকে আছে। কিন্তু কেনাবেচা বন্ধ থাকায় সাধারণ দোকানগুলো খুব বিপদে পড়েছে।
পুরানা পল্টনের ‘রিপন আর্মস কোম্পানি’র মালিক মোকাররম হোসেন খান জানান, এমন কিছু দোকানও আছে যেখানে গত ৯ মাসে একটি অস্ত্রও বিক্রি হয়নি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সব জেলা প্রশাসককে আগ্নেয়াস্ত্রের নতুন আবেদন পরীক্ষা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (রাজনৈতিক-৪ শাখা) আবেদা আফসারী টাইমসের কাছে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনা, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলার আগ্নেয়াস্ত্র শাখায় ইতিমধ্যে ছোট ও বড় অস্ত্রের জন্য কয়েকশ আবেদন জমা হয়ে আছে। মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর আবেদন যাচাই ও সাক্ষাৎকারের কাজ শুরু হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী টাইমসকে বলেন, যারা বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু লাইসেন্স দিলেই কাজ শেষ নয়, অস্ত্রের ব্যবহারও নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে। কারণ, লাইসেন্স পাওয়ার পর কেউ যেন সেই অস্ত্র দিয়ে অপরাধ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা সরকারের কাজ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখা হয়। আগের সরকারের সময়ে দেওয়া লাইসেন্সগুলোও আবার পরীক্ষা করার কথা জানায় অন্তর্বর্তী সরকার।
থানা, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) লাইসেন্সধারীদের তথ্য সংগ্রহ করছে। কর্মকর্তারা জানান, লাইসেন্সধারীর রাজনৈতিক পরিচয়ও এখানে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
কী শর্তে মিলবে লাইসেন্স
বড় অস্ত্রের জন্য জেলা প্রশাসক এবং ছোট অস্ত্রের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হয়।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ব্যক্তিরা নিজ স্থায়ী ঠিকানার অনুকূলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারেন।
ফৌজদারি মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হলে আবেদন করা যায় না। আর কেউ আদালত থেকে সাজাপ্রাপ্ত হলে, সাজা শেষের পাঁচ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত তিনি অযোগ্য বলে গণ্য হন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা জানান, বড় অস্ত্রের আবেদনের ক্ষেত্রে পরপর তিন বছর বছরে অন্তত দুই লাখ টাকা করে মোট ৬ লাখ টাকা এবং ছোট অস্ত্রের জন্য বছরে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১৫ লাখ টাকা আয়কর দেওয়ার তথ্য প্রমাণ থাকতে হবে।
আয়কর রিটার্নের পাশাপাশি পুলিশ ও এসবি ইতিবাচক রিপোর্ট দিলে সাক্ষাৎকার শেষে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।
আগে লাইসেন্স পাওয়ার পর শটগান ও বন্দুকের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা এবং পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের জন্য ৫ হাজার টাকা আয়কর ধার্য ছিল। এখন তা বাড়িয়ে শটগান ও বন্দুকের জন্য ৫০ হাজার এবং পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের জন্য ১ লাখ টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন করার ফি-ও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে শটগান ও বন্দুকের নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা এবং পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেলের জন্য ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ আর্মস ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসির আহমেদ জানান, দেশে ৬টি প্রতিষ্ঠান অস্ত্র আমদানি করে। আর অস্ত্র ও গুলি বিক্রির জন্য বৈধ দোকান রয়েছে ৮৮টি।
ঢাকার বিজয়নগর ও পল্টন এলাকায় এমন বেশ কিছু দোকান রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, পিস্তল ও রিভলবারের চেয়ে শটগান, একনলা ও দোনলা বন্দুক এবং সেকেন্দার বন্দুকের (পাকিস্তানের একটি কোম্পানির তৈরি শটগান) বেচাকেনা বেশি হয়।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, বাংলাদেশে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, তুরস্ক, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও স্লোভাকিয়ার তৈরি অস্ত্রের চাহিদা বেশি।
পিস্তল ও রিভলবারের দাম সাধারণত ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং শটগান ও বন্দুক ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর ভিত্তি করে এই দাম কম-বেশি হতে পারে।
হাজার হাজার অস্ত্রের হদিস নেই
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, দেশে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত বৈধ অস্ত্র রয়েছে ৫৩ হাজার ৭০২টি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত লাইসেন্স রয়েছে ৪৮ হাজার ২৮৩টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ৮৫৪টি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে ৫৬৫টি অস্ত্র।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ২৭ হাজার ৯৯৫টি ব্যক্তিগত অস্ত্র থানায় জমা পড়লেও ২০ হাজার ২৮৮টি অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি।
শুধু ঢাকা শহরে নিবন্ধিত ৩ হাজার ৯৯১টি অস্ত্রের মধ্যে ৭৪০টি অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, নির্দেশ দেওয়ার পরও যেসব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি, সেগুলো উদ্ধারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব লাইসেন্সধারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে এ পর্যন্ত ১১৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আরও বেশ কিছু লাইসেন্স বাতিলের কাজ চলছে।
আওয়ামী লীগ আমলে দেওয়া লাইসেন্স
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরে ২০ হাজার ১৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০৬ জন লাইসেন্স পেলেও কোনো অস্ত্র কেনেননি।
ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে ২ হাজার ১৫৩টি, সামরিক কর্মকর্তাদের নামে ৯৩৩টি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নামে ৭৭৭টি অস্ত্র রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে বহু অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। সেগুলো এখন আবার নতুন করে পরীক্ষা করার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উদ্বেগের কারণ
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের বহু থানা লুট হয়। তখন পুলিশের অস্ত্রের সঙ্গে সেখানে জমা থাকা ব্যক্তির লাইসেন্স করা অস্ত্রও চুরি হয়ে যায়। তবে সেই অস্ত্রের সঠিক হিসাব পুলিশ জানায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত চুরি হওয়া ৫২১টি অস্ত্র বিভিন্ন মাধ্যমে জমা পড়েছে। আর অভিযানে উদ্ধার হয়েছে লাইসেন্স করা ৩৩টি অস্ত্র। কিন্তু ব্যক্তিপর্যায়ের ২১৪টি অস্ত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম টাইমসকে বলেন, অতীতে বৈধ অস্ত্র দিয়ে অপরাধ করার ইতিহাস রয়েছে।
তিনি জানান, লাইসেন্স দেওয়ার পর সেই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়মিত তদারকি করতে হবে, যাতে কেউ জোরজুলুম, চাঁদাবাজি বা ভয়ভীতি দেখাতে তা ব্যবহার করতে না পারে।
তার মতে, রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে আবেদনকারীর নিরাপত্তাঝুঁকি এবং প্রয়োজনীয়তা যাচাই করেই কেবল লাইসেন্স দেওয়া উচিত।


